Home » জাতীয় » জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে যা নেব

জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে যা নেব

বাংলার কন্ঠস্বর // বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবিপাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বাঙালির সংগ্রামের সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এর তীব্রতা ও গভীরতা বাড়ে ১৯৬০-এর দশক থেকে। দুই দশকব্যাপী এই আন্দোলনে সবচেয়ে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান, যাঁকে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে মানুষ শুধুই বঙ্গবন্ধু নামে অভিহিত করতে শুরু করে। পাকিস্তানিরা তাঁকেই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ও শত্রু বিবেচনা করত। ১৮ বার তাঁকে তারা কারাগারে পাঠিয়েছে, সাড়ে ১৩ বছরের মতো ছিল তাঁর কারাবাস। তাঁকে ২৪টি মামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁর মুক্তির প্রশ্নে কোনো আপসে যাননি। তাঁর আত্মসম্মানবোধ তাঁর আত্মবিশ্বাসের মতোই ছিল দৃঢ়। তাঁর মতো অকুতোভয় ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। সেই সঙ্গে তাঁর ছিল মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার, দেশপ্রেমের আদর্শে তাদের সংগঠিত করার এক অসাধারণ ক্ষমতা। তাঁর বাগ্মিতা ছিল জাদুবিস্তারী, যার উদাহরণ একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণ।

আজ বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী। আজ থেকে মুজিব বর্ষের শুরু। বছরব্যাপী নানা আয়োজনে-অনুষ্ঠানে আমরা তাঁকে স্মরণ করব, তাঁর রাজনীতি; মানুষ ও দেশ নিয়ে, কৃষি, সমবায়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা—এসব নানা বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা করব। তবে এসব উদ্‌যাপন, আলোচনা এবং স্মৃতিতর্পণ যদি আনুষ্ঠানিকতার খোলসেই আটকে থাকে, যদি আমাদের অফুরন্ত কথার সঙ্গে কাজের কোনো সম্পর্ক না থাকে, তাহলে রাজনীতি থেকে নিয়ে শিক্ষা, প্রশাসন থেকে নিয়ে সমাজ—সব ক্ষেত্রেই গুণগত ও মানগত উন্নতি সাধনের সুযোগটি আমরা হারাব। দিনের শেষে আমাদের অর্জনের খাতার পৃষ্ঠাগুলো খালিই থেকে যাবে।

রাজনীতির কথাই ধরা যাক, যেহেতু রাজনীতিই আধুনিক একটি দেশের প্রধান চালিকা শক্তি। নিখাদ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রয়োজন বাংলাদেশের মানুষ যতটা অনুভব করেছে, ততটা খুব কম দেশের মানুষ করেছে। একাত্তরে আমাদের যুদ্ধ শুধু পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধেই ছিল না, ছিল একটি গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, বৈষম্যমুক্ত, উদার–মানবিক এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য। অথচ দুঃখজনভাবে এই রাষ্ট্রেই সামরিক এবং ছদ্মবেশী সামরিক শাসন চলেছে দীর্ঘদিন। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর গণতান্ত্রিক যে কাঠামোটি তৈরি হয়েছে, সেটি অনেক দিক দিয়ে অপূর্ণ রয়ে গেছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের। তাঁর রাজনীতির একটি প্রস্তুতি পর্ব ছিল, একটি সংগঠন পর্ব ছিল, একটি প্রতিরোধ পর্বও ছিল। তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করেছেন। গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে সারা জীবন লড়েছেন। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা তাঁর গণতন্ত্র-দর্শনের একটি পূর্বাপর ছবি তুলে ধরে। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলেছেন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার কথা বলেছেন, মানুষের অধিকারের বিষয়ে বলেছেন। তাঁর অনেক ভাষণ এখন শোনা যায়। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া একটি ভাষণে তিনি চোরাকারবারি, ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের রুখে দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই মুজিব বর্ষে এসে আমরা দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধুর দলের ভেতরেই যেন তাঁর এই আহ্বানের কোনো মূল্য নেই। দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী। লুটপাট এখন ব্যাংক ও মেগা প্রকল্প হয়ে ক্যাসিনো–কাণ্ডে ও বালিশ–কাণ্ডেও পরিব্যাপ্ত। দলের পদগুলো এখন অনেক অর্থে লোভনীয়। ছাত্রনেতাদের নানা বাণিজ্যের এবং অনাচারের খবর থাকে পত্রিকাজুড়ে। বঙ্গবন্ধুর দলের নেতারা বলেন বটে আইন সবার জন্য সমান, অপরাধী যে দলেরই হোক ক্ষমা নেই, কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন সামান্যই। এক সাবেক সাংসদকে জামিন না দেওয়ার কারণে এক বিচারককে তিন ঘণ্টার মধ্যে বদলি করে দেওয়া হলো। এটি ঘটল মুজিব বর্ষের প্রাক্কালে। এ রকম আরও কত উদাহরণ আমাদের চারদিকে।

মুজিব বর্ষকে প্রকৃত অর্থে অর্থবহ করতে হলে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা দেখাতে হলে বঙ্গবন্ধুর দলকে এবং দলের সরকারকে সারা বছর ধরে ঘর গোছাতে হবে। দুর্নীতি নির্মূলের জন্য যত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন, নিতে হবে। আদালতকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সৎ ও নীতিমান যাঁরা আদালতে–প্রশাসনে আছেন, তাঁদের পুরস্কার দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তিরস্কার যেন তাঁদের না জোটে। নির্বাচনব্যবস্থাকে ত্রুটিহীন করে মানুষের আস্থার ভেতরে নিয়ে আসতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে জাতীয় থেকে নিয়ে স্থানীয় একটি দৈনন্দিন চর্চায় পরিণত করতে হবে। সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে লাভটা হয় জনগণের এবং সরকারেরও। যদি সরকারের সমালোচনা সহ্য করে ভুল শোধরানো ও সংস্কারের পথে যাওয়ার আগ্রহ থাকে। সেই আগ্রহটা দ্রুতই তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, কথা বলা একেবারে কমিয়ে কাজ এক শ গুণ বাড়িয়ে দিতে হবে।

গত ১০ বছরে আমাদের অর্থনীতিতে বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে। সমাজ গতিশীল হয়েছে। তারুণ্যের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য এসেছে। মানুষ বাংলাদেশকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে চায়। এখন যদি গণতন্ত্র স্বচ্ছ হয়, প্রশাসনে জবাবদিহি থাকে, বিচারব্যবস্থা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে, পুলিশ জনবান্ধব হয়, শিক্ষা মানমুখী হয়, দেশ এগোবে আরও বিস্ময়কর গতিতে।

মুজিব বর্ষ শেষে এই এগোনোর ছবিটা যেন সব মানুষ আনন্দের সঙ্গে দেখে, এটি আমরা কামনা করতেই পারি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর শততম জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

পাঠকের মতামত...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*