Home » লিড নিউজ » অজুহাত কোভিড-১৯ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না কেউ

অজুহাত কোভিড-১৯ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না কেউ

বাংলার কন্ঠস্বর // করোনাভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধির পর থেকে দেশে কেউ কোনো ধরনের চিকিৎসা পাচ্ছেন না। নির্ধারিত হাসপাতালে কোভিড আক্রান্তরা তেমন চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। একইভাবে সাধারণ ও বিশেষায়িত হাসপাতালেও চিকিৎসা পাচ্ছেন না অন্য রোগে আক্রান্তরা। ফলে সব ধরনের রোগীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। স্বজনরা রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে হয়রান হচ্ছেন। কোথাও ভর্তি করতে পারছেন না। কোনো কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাইছে রোগীর কোভিড নেই মর্মে প্রত্যয়নপত্র। এ পরিস্থিতিতে অনেক সময় পথেই রোগী চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক সন্তানও নির্বাক হয়ে দেখছেন বাবা-মা অথবা স্বজনদের চলে যাওয়া। তারাও কিছুই করতে পারছেন না। অথচ প্রতিটি হাসপাতালই রোগী ভর্তি না করার পেছনে তাদের খোঁড়া যুক্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া রোগী সম্পর্কে নিজেদের মতো করেই ব্যাখ্যা দিচ্ছে। অসুস্থদের ভর্তি না নেয়া এবং চিকিৎসাসেবা না দেয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ দেশের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। করোনাভাইরাসের প্রকোপ যত বাড়ছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাও ততটাই প্রকাশ পাচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন বিশিষ্টজনরাএ প্রসঙ্গে খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইউজিসি অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন না, চিকিৎসা পাবেন না-এটা ঠিক নয়। তিনি বলেন, ঢালাওভাবে রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। বিনা চিকিৎসায় কারও যেন মৃত্যু না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ বলেন, আগে হাসপাতালে আউটডোর-ইনডোরে রোগী ভর্তি থাকত, এখন তারা কোথায়। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না বলেই এরা চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক চিকিৎসক ভয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন না, এটা কোনোভাবেই ঠিক হচ্ছে না। চিকিৎসাসেবার বর্তমান অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয়া হয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে চিকিৎসকদের কেন এত ভয়? বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেয়ার কারণে। এমনকি চিকিৎসক পরিবারের রোগীরাও পাচ্ছেন না হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা।হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হতে না পারার বিষয়টি যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমবার তিন ঘণ্টা হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে রিমন সাউদ (২৪)। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে হার্ট অ্যাটাক করেন বাবা ইয়ার হোসেন (৬০)। ছেলের মৃত্যুর এক ঘণ্টা পর বাবাকেও মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। রিমন সাউদের চাচাতো ভাই মাসুম সাউদ বলেন, রোববার রাত ৩টার দিকে রিমন অসুস্থবোধ করলে তাকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু করোনার উপসর্গ জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট থাকায় কোনো হাসপাতাল ভর্তি করেনি। অবশেষে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ভোর ৬টার দিকে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

শনিবার মারা গেছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার। শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তিনি কিডনি রোগে ভুগছিলেন। খাদ্য সচিব বলেন, ওনার করোনা হয়নি। ওনার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। তার কিডনিরও সমস্যা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তিনবার তার ডায়ালিসিস করতে হতো। করোনা পরিস্থিতিতে উনি ঠিকমতো ডায়ালিসিস করাতে পারেননি। নিহতের মেয়ে ডা. সুস্মিতা জানান, অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ঘুরেছেন রাজধানীর একের পর এক ৯টি হাসপাতালে। কেউ চিকিৎসা দিতে রাজি হয়নি। কোথাও চিকিৎসা না পেয়ে শেষে বৃহস্পতিবার কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এই আমলাকে। পরে শনিবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।

গত ১৯ এপ্রিলের ঘটনা। রাজধানীর ১১টি হাসপাতালে স্বামীকে নিয়ে ঘুরেছেন মিনু বেগম। কোনো হাসপাতালেই চিকিৎসা হয়নি স্বামী আমিনুলের (৫২)। সর্বশেষ কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকেও ফিরিয়ে দেয়া হয় তাকে। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রওনা দেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশে। ওই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান আমিনুল। রাজধানীর মিরপুর-১১-এর বাসিন্দা আমিনুল মারা যাওয়ার আগে দুই সপ্তাহ শ্বাসকষ্ট ও গ্যাস্ট্রিকের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। স্বজনরা জানান, আমিনুল অ্যাজমার রোগী ছিলেন। মাঝেমধ্যেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা হতো। স্বজনদের অভিযোগ- রাজধানীর ১১টি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ঘুরলেও করোনা সন্দেহে কেউ তার চিকিৎসা দিতে রাজি হয়নি। মিনু বেগম বলেন, গত দশ-পনেরো দিনে তার অ্যাজমা বেড়ে যায়। তার চিকিৎসার জন্য এই শহরে এগারোটি হাসপাতালে গিয়েছি। সবাই করোনা সন্দেহে আমার স্বামীর চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দিয়েছে। করোনা সংকটকালে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। সোমবার এক ভিডিও বার্তায় হানিফ বলেন, ব্যাপক উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার মধ্যেই ধীরে ধীরে দেশের সব প্রান্তে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। জীবন ও জীবিকা দুটোই আজ বিপন্ন। জীবন ও জীবিকার জন্য আমরা লড়াই করে যাচ্ছি। করোনাভাইরাসের প্রকোপ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাও ততটাই প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকাশ পাচ্ছে আমাদের সামর্থ্যরে ঘাটতি ও সমন্বয়ের অভাবের চিত্র।

দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে একের পর এক অসুস্থ রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার অভিযোগ আসছে। একটু চিকিৎসার জন্য প্রতিনিয়ত শত অনুনয় করেও হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না অসংখ্য রোগী। মুমূর্ষুর জীবন বাঁচাতে অসহায় স্বজনরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন। শুধু সাধারণ রোগীই নন, এ থেকে বাদ যাচ্ছে না সরকারি বড় কর্তারাও। কিন্তু সবার পরিণতি প্রায় একই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, আমাদের হাসপাতালে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় দেড়শ’ চিকিৎসক বসেন। কিন্তু করোনা আসার পর আমরা মাত্র পনেরো থেকে বিশজন চিকিৎসক আছি। ফলে চিকিৎসক সংকটও রয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা না পাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দিতে আগ্রহী না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বেশি অসুস্থ রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

দেশে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় ইতোমধ্যে কিছু হাসপাতাল নির্ধারণ করা হয়েছে। কিছু হাসপাতালে পৃথক ইউনিট খোলা হয়েছে। অভিযোগ আছে- নির্ধারিত হাসপাতালে কোভিড রোগীদেরও যথেষ্ট চিকিৎসা হচ্ছে না। আক্রান্তদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন নির্দিষ্ট হাসপাতালে তাদের দেখার জন্য চিকিৎসক আসেন না। নিয়মিত তাদের রুম পরিষ্কার করা হয় না। দরজার বাইরে খাবার এবং ওষুধ রাখা হয়। সেখান থেকে রোগীদের নিয়ে আসতে হয়। এদিকে অন্য রোগীদের ভর্তিই করা হচ্ছে না। যাদের ভর্তি করা হচ্ছে তারাও সেভাবে চিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন অনেকেই। কাজেই আলাদা হাসপাতাল বা একই হাসপাতালে দুটি উইং করেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো সেবা পাওয়া যাবে এই আশায় হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

এর আগে গত ৭ এপ্রিল দেশে নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় যেসব চিকিৎসক প্রত্যক্ষভাবে জনগণের সেবা নিশ্চিতে এগিয়ে আসেননি তাদের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন হাসপাতালে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না, এমন খবর পাওয়ার কথা তুলে তিনি বলেছেন, যেসব চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন না, ভবিষ্যতে তারা চাকরি করতে পারবেন কি না, তা ভাবা হবে। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে চিকিৎসক-নার্স নিয়ে আসার কথাও বলেন তিনি। ওই দিন এক ভিডিও করফারেন্সে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না-এই বিষয়টি ভাবা যায় না, এটা ঠিক হচ্ছে না। শুরুতেই বলা হয়েছিল, কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের জন্য পৃথক চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে। যাতে কেউ চিকিৎসাবঞ্চিত না হন। কিন্তু হাসপাতালে রোগীরা গেলে বলা হচ্ছে অন্য কথা। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, আজ এই বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হবে। সেই আলোচনায় এই সমস্যার একটি সমাধান হবে বলেও মনে করেন তিনি।

পাঠকের মতামত...

Total Page Visits: 4 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*