Home » সম্পাদকীয় » খোলা কলাম » খোকনপুত্রের ফেসবুক স্ট্যাটাসে কঠিন উম্মোচন

খোকনপুত্রের ফেসবুক স্ট্যাটাসে কঠিন উম্মোচন

আলম রায়হান //
করোনা সংক্রমণে মারা গেছেন সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকন। ২৮ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে হাসপাতালে মারা যান তিনি। দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার নগর সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৪৭ বছর। তিনি দুই মেয়ে, এক ছেলে রেখে গেছেন।

এটি পুরনো খবর। করোনা মহামারিতে মৃত্যুর মিছিলে এ মৃত্যু খবর গুরুত্বহীনও মনে হতে পরে। আরো, গুরুত্বহীন খবর হচ্ছে, নাঈম ভাইর উদ্ভাবনী উদ্যোগ দৈনিক আমাদের সময়-এর সূচনা পর্বে আমরা একত্রে কাজ করেছি। তাকে চিনি সেই থেকে। দুই দশকের ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাতও তখন থেকেই। সে খুবই অসময়ে চলে গেলো। এ চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে খোকন পুত্র আশরাফুল আবির ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। যাতে খুবই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে সাংবাদিকদের আর্থিক অনটনের হৃদয়বিদারক চিত্র। সঙ্গে আরো কিছু নিদারুণ বাস্তবতার চিত্র।

করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুপুরির আতঙ্কে সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের মুত্যু সংবাদ তেমন প্রভাব ফেলেনি সাধারনের মধ্যে। এ মৃত্যুতে যারা খুবই ব্যথিত হয়েছেন তারাও যে খুব ভাবার অবস্থায় আছেন- তাও মনে হয় না। কারণ সবাই অজানা আতঙ্কে তাড়িত হচ্ছেন। কিন্তু পিতার মৃত্যুকালীন যে বর্ণনা দিয়েছেন খোকন পুত্র আশরাফুল আবির তাতে অনেকে বেশ হোচট খেয়েছেন বলে মনে হয়। এ একটি কঠিন বাস্তবতা উম্মোচনের দলিল হয়ে আছে। অনেকের কাছেই সাংবাদিকের প্রকৃত অবস্থা আবার স্পষ্ট হয়েছে। অথচ প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের কতই না গালমন্দ করা হয়। যেনো সাংবাদিকদেরই সকল দোষ।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে খোকন পুত্র আশরাফুল আবির লিখেছেন, ‘বাবার ৩-৪ দিন ধরে কাশি। আমি বললাম, আপনার করোনা হয়নি তো? সে হেসে বললো, আরে ধুর বেটা। টন্সিলের ব্যথা। এইটা আগের থেকেই ছিল। ওইরকম কিছু না। কারণ সে চাচ্ছিলো বাসায় থেকেই ট্রিটমেন্ট নিয়ে সুস্থ হতে। কারণ করোনা পজিটিভ হলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়াবে। এ ছাড়া লজ্জার ভয়ে সে তখন ও এইটা সাধারণ ভাবেই দেখছিল।’ আশরাফুল আবির লিখেছেন, ‘হঠাৎ দেখলাম সে যেনো কেমন করছে। মনে হলো, সে ওই মুহূর্তে লড়াইর সাথে পেরে উঠতে পারেনি। আম্মু বলল, অ্যাম্বুলেন্স খবর দেওয়া হয়েছে। উত্তরার রিজেন্ট এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স আসছে। আম্মু বলল তোর কাছে কি ভাংতি টাকা আছে, আমাকে দে তো।’

আশরাফুল আবির লিখেছেন, ‘আমার কাছে ৩৫০০ টাকা ছিল আমি পুরাটাই আম্মুকে দিয়ে দিলাম সাথে সাথে। আমি ঘরে পরার জামা পরেই অ্যাম্বুলেন্স এ উঠে গেলাম। কারণ আমার মনে হচ্ছিলো এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। আমি ভাবলাম হাসপাতালে হয়তো অনেকেই থাকবে আব্বুর জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম আমি আর আম্মু ছাড়া পরিচিত কেউ নেই। কারণ লকডাউন থাকার জন্য গাড়ি তেমন চলে না রাস্তায়। এ ছাড়া লক্ষণগুলোর বর্ণনা শুনে হয়তো কেউ আসতে সাহস করেননি।’

আশরাফলু আবির লিখেছেন, ‘এইদিকে শাবান আঙ্কেল সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল ওইখানে। তারা সর্বাত্মক চেষ্টাই করেছিলেন আইসিউইতে রেখে অক্সিজেন দেওয়ার। কিন্তু ডাক্তার বলল তার পালস নেই এবং ব্রেইন ও অক্সিজেন নিচ্ছে না। ডাইরেক্টলি বললেন না, সে আগেই মারা গেছে। বললেন আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। দোয়া করেন ব্রেইন হঠাৎ মিরাকেলি যদি কাজ করতে শুরু করে। রাত ১০টার দিকে আম্মুকে উপরে ডাকলো শেষবারের মতো দেখার জন্য। তখন আম্মু ফোনে কয়েকজনকে জানিয়ে দেয়। এ ছাড়া নিউস স্ক্রলগুলাতেও অফিসিয়ালি আপডেট দিয়ে দেয় যে, বাবা আর নেই। এখন বাবার করোনা টেস্ট হওয়ার আগেই মারা গেছেন তাই এইটা অফিসিয়ালি বলা হয়নি। বলা হয়েছে যে করোনা ভাইরাস এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।’

খোকন পুত্র আশরাফুল আবিরের ফেইসবুক স্ট্যাটাসে প্রধান পয়েন্ট চারটি। এক. খোকন ৩-৪ দিন ধরে ভোগছিলেন, অবস্থা জটিল ছিল। কিন্তু হাসপাতালে যেতে চাননি। দুই. অ্যাম্বুলেন্স খবর দেবার পর খোকনের স্ত্রী ছেলের কাছে ‘খুচরা’ টাকা চেয়েছেন এবং ছেলে তার কাছে থাকা পুরো ৩৫০০ টাকা মায়ের হাতে দিয়ে দিয়েছেন। তিন. হাসপাতালে খোকনের স্ত্রী এবং পুত্র ছাড়া আর কেউ যাননি। এবং চার. (শাবান আঙ্কেল) শাবান মাহমুদ হাসপাতালে সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

পরিস্থিতি একটু পর্যালোচনা করা যাক। খোকন ভুগছিলো ৩/৪ দিন ধরে। কিন্তু হাসপাতালে যেতে চায়নি। কেন? এক. হয় হাসপাতালের ওপর তার ভরসা ছিলো না। দুই. না হয় তার কাছে টাকা ছিলো না। চিকিৎসা ব্যবস্থা অথবা হাসপাতারের ওপর খোকনের ভরসা ছিলো কি ছিলো না তা নিশ্চিত হয়ে বলার আর উপায় নেই। কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তার কাছে টাকা ছিলো না। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স খবর দেওয়ার পর পুত্রের কাছে মায়ের ‘খুচরা’ টাকা চাওয়া। এবং পুত্রের ‘সব টাকা’ মিলিয়ে হয়েছে সাড়ে তিন হাজার। খোকনের কাছে টাকা থাকলে তা তার স্ত্রীর জানা থাকতো। তার নিজের কাছেও থাকতো। আর পুত্রের কাছে সবমিলিয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা হতো না। খোকনের মৃত্যুর ঘটনায় অবার প্রমাণিত হলো, সাংবাদিকরা কী অনটনে জীবন কাটান!

অ্যাম্বুলেন্সে করে গুরুতর অসুস্থ (বাস্তবে মৃত) হুমায়ুন কবীর খোকনকে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয় তখন স্ত্রী-পুত্র ছাড়া খোকনের আর কেউ সেখানে ছিলেন না। এতে আবার প্রমাণিত হলো, চরম বিপদে মহান আল্লাহ্ এবং স্ত্রী-পুত্রই ভরসা। হাসপাতালে ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন শাবান মাহমুদ। হুমায়ুন কবীর খোকনের মতো শাবান মাহমুদও দৈনিক আমাদের সময়-এ কাজ করেছেন। তারা সাবেক কলিগ। এর চেয়ে বড় কথা, শাবান মাহমুদ সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতা। প্রশ্ন হচ্ছে, খোকনের আর কি কোন সাবেক অথবা বর্তমান কলিগ ছিলেন না? আর সাংবাদিক নেতা! নেতার সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে কিনা, তাই সন্দেহ। সাংবাদিক সংগঠনই তো হালিতে হালিতে। কিন্তু বিপদে সেই সবেধনমণি শাবান মাহমুদই!

এতো বেদনার মধ্যেও মোটামুটি এক তামাশার খবর পাওয়া গেলো। তা হচ্ছে, প্রয়াত হুমায়ুন কবির খোকনের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে দৈনিক সময়ের আলো। সঙ্কটময় এই মুহূর্তে পরিবারের দেখাশোনাসহ অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ২৯ এপ্রিল গণমাধ্যমে এ কথা জানিয়েছেন সময়ের আলোর প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। তার দাবি, হুমায়ুন কবীর খোকন অসুস্থ্য হওয়ার পর থেকে মৃত্যু এবং দাফন পর্যন্ত সবকিছুই তারা আন্তরিকভাবে তত্ত্বাবধান করেছেন। সময়ের আলোর প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ আরো বলেন, সময়ের আলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তারা সাংবাদিক মরহুম হুমায়ুন কবীর খোকনের পরিবারের যাবতীয় দায়িত্বগ্রহণ করেছেন। হুমায়ুন কবীর খোকনের স্ত্রী অথবা সন্তানদের কেউ চাকরি উপযুক্ত থাকলে যোগ্যতা অনুযায়ী সময়ের আলোতে তাদেরকে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানিয়েছেন গাজী আহমেদ উল্লাহ।

প্রশ্ন হচ্ছে, দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার এই কথিত কর্তৃপক্ষ কী অসুস্থ খোকনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন? ঘোরতর সন্দেহ আছে। দাঁড়ালে কয়েকদিন ভোগার পর প্রায় মৃত অথবা মৃত খোকনকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় পুত্রের কাছ থেকে খোকন স্ত্রীকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নেওয়ার প্রয়োজন পড়তো না। আমার তো মনে হয়, খোকনের বেতনই বকেয়া আছে। এখন মহান সাজার চেষ্টা করছেন পত্রিকাটির কথিত কর্তৃপক্ষ! খোকনের মৃত্যুর আগে এই পত্রিকাটির নাম শুনছি বলেও তো মনে হয় না। সমাজে কিছু শৃগাল স্বভাবের লোক আছে, যারা মিডিয়া জগতে আশ্রয় নেয়। নানান ধান্ধা করে আর বেগার খাটায় বিপন্ন সাংবাদিকদেরকে। সরকারের নীতিমালা এবং সাংবাদিকেদের অসহায়ত্বের সুবিধা নেয় এইসব ভূঁইফোড় কর্তৃপক্ষ।

সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের মৃত্যু অসংখ্য প্রশ্ন রেখে গেছে। আবার নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা, সংবাদপত্র জগত এবং সাংবাদিকদের জীবন চিত্র। সাংবাদিকদের জীবন ধারা তো সূর্য দীঘল বাড়ীর মতোই করুন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অবিভক্ত ভারতের ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে বাংলায় ‘পঞ্চাশের আকাল’ নামে যে দুর্ভিক্ষ-দুর্যোগ এবং তাতে বহু দরিদ্র মানুষ প্রাণহানী হয় তারই চিত্র ফুটিযে তোলা হয়েছে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ সিনেমায়। ব্যবসায়ীদের কারসাকি কি থেমেছে? চলমান দুর্যোগ জটিলতর হয়েছে কোন ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে?

হেল্থ সেক্টরে তো বেশ কিছু শকুন অতি তৎপর দেখা যাচ্ছে করোনা আগ্রাসনের শুরু থেকেই। স্বাস্থ্যখাত খামচে ধরা এই শকুনদের চাপে শেখ সেলিম, মোহাম্মদ নাসিমের মতো নেতাকেও স্বাস্থমন্ত্রী হিসেবে কখনো কখনো অসহায় অথবা আপোসকামী বা অংশগ্রহণকারী মনে করেছেন কেউ কেউ। আর বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন! কিছুই বলার প্রয়োজন পড়ে না। তার সক্ষমতা সম্পর্কে দেশবাসীর স্পষ্ট ধারণা আছে! তবে অংশ গ্রহণের বিষয়ে এখানো তেমন অভিযোগ ওঠেনি বলে ধারনা করা হয়।
লেখক:আলম রায়হান , জেষ্ঠ্য সাংবাদিক।

পাঠকের মতামত...

Total Page Visits: 18 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*