Home » লিড নিউজ » ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে বরিশালে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে বরিশালে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

বাংলার কন্ঠস্বর // প্রলংকারী ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ বাংলাদেশ তথা বরিশাল অঞ্চলে সররাসরি আঘাত না হানলেও এর প্রভাবে বেশ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে। বুধবার রাতের দীর্ঘস্থায়ী এই ঝড়ে ভোলা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীতে প্রাণহানি ঘটেছে অন্তত সাতজনের। বরিশাল বিভাগের আওতাধীন ছয় জেলার বিভিন্ন স্থানে উপড়ে পড়েছে বিশাল বিশাল গাছসহ বসতঘর-বাড়ি। বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকারে আছে শতাধিক গ্রাম। এছাড়া জেলাসমূহের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফলে মৌসুমী ফসলেরও প্রচুর ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও টাকার পরিমাণে এর সংখ্যা কত তা তাৎক্ষণিকভাবে বলতে পারছে না।

বরিশাল আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়- বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঘুর্ণিজড় ‘আম্ফান’ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল সুন্দরবন উপকূলে আছড়ে পড়লে আশপাশ জেলাগুলোতে এর প্রভাবে পড়ে। বিশেষ করে গভীর রাত ১২ টা পর্যন্ত তান্ডব চলে বরিশালের ৬টি জেলায়। ৫ ঘণ্টার এই দীর্ঘ সময়ে বরিশাল তথা আশপাশ জেলাসমূহে ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮৩ কিলোমিটার। এবং বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৬০ মিলিমিটার। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি নিম্নচাপে রুপ নেওয়ার পরে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর ও নদীতে এক নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এই দপ্তরের অধিকর্তা আব্দুল হালিম বরিশালটাইমসের এ প্রতিবেদককে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অফিস সূত্র জানায়- আম্ফানের প্রভাবে ভোলা জেলায় দুজন, পটুয়াখালীতে দুজন ও পিরোজপুর তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের প্রাক্কালে ভোলার রামদাসপুর চ্যানেলে ৩০ যাত্রীসহ একটি ট্রলার ডুবে রফিকুল ইসলাম নামে একজন নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম এলাকায়। ওই ব্যক্তিসহ ৩০ যাত্রী লক্ষীপুর জেলার মজুচৌধুরী ঘাট থেকে ট্রলারযোগে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে ভোলায় যাচ্ছিলে। রাজাপুর সুলতানীঘাটের কাছে গেলে তাদের ট্রলারটি ডুবে গেলে ¯্রােতের টানে ভেসে যান রফিকুল ইসলাম। পরে তার লাশ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। একই জেলার চরফ্যাশন উপজেলার আইচা থানার চর কচ্ছুপিয়া এলাকার সিদ্দিক ফকির (৭০) নামে এক বৃদ্ধ বুধবার সকাল ৯টার দিকে রেইনট্রি গাছচাপায় মারা যান।

অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় রাশেদ (৬) নামে এক শিশু ও কলাপাড়ায় শাহ আলম নামে সিপিপি’র এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি এলাকায় ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ৬ বছরের শিশু রাশেদ মারা যায়। পার্শ্ববর্তী কলাপাড়া উপজেলায় জনগণকে সচেতন করতে গিয়ে মো. শাহ আলম মীর (৫৫) নামে একজন ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) কর্মীর মৃত্যু হয়। বুধবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নে খেয়া পার হওয়ার সময় পানিতে পড়ে তিনি নিখোঁজ হন। পরে সন্ধ্যায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’র কারণে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় দুজন এবং ইন্দুরকানী উপজেলায় একজন মারা গেছে। বুধবার সন্ধ্যার পরে মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের শাহজাহান মোল্লা শহরের কলেজের পেছনে বাসায় যাওয়ার পথে দেয়াল ভেঙে মারা গেছেন। উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ধুপতি গ্রামের বিধবা গোলেনুর বেগম ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ে নিজের ঝুঁকিপূর্ণ ঘর থেকে পাশের ঘরে যাওয়ার পথে বাতাসের তীব্রতায় পা পিছলে পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। রাতে জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার উমিদপুর গ্রামে শাহ আলমের বাড়িতে পানি প্রবেশ করলে ঘরেই আতঙ্কিত হয়ে স্ট্রোক করে মারা যান।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফনের প্রভাবে বরিশালসহ প্রতিটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে মাছের ঘেরসহ ফসলি জমি তলিয়ে আছে। উপকুলীয় এলাকায় বিশেষ করে ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে শহর রক্ষাবাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ঝড়োহাওয়ায় প্রতিটি জেলা শহরে বড় বড় গাছপালা উপড়ে পড়েছে। কোথাও বৃহৎকার গাছ বৈদ্যুতিক তারের ওপর পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অন্ধকারে রয়েছে বরিশাল অঞ্চলের লক্ষাধিক বিদ্যুৎ গ্রাহক। তবে এই ঘূর্ণিঝড়ে সবচে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কৃষি বিভাগ।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি অফিস সূত্র জানায়- ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বিভাগের ছয় জেলার লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে আছে। এসব জমির ফসল বিশেষ করে শাক সব্জি, সয়াবিন, তিল, মরিচ ইতিমধ্যে বিনষ্ট হয়েছে। এছাড়া আগামী ২/১ দিনের পানি না নামলে রোপা আউশ ধান, পান, ভুট্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু এই ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বরিশাল জেলা কৃষি কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বরিশালটাইমকে জানান, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ, উজিরপুর ও বাকেরগঞ্জে ফসলের বেশি ক্ষতি হয়েছে। উজিরপুরের সাতলায় একটি বাধ ভেঙে গিয়ে ফসলী জমি তলিয়ে আছে। এছাড়া বাকেরগঞ্জের মৌ-দুধল ও নলুয়া গ্রাম প্লাবিত হয়ে কয়েক হেক্টর জমির ধান পানির নিচে রয়েছে। অনুরুপ মেহেন্দিগঞ্জেও ক্ষতি হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন করা সম্ভব হয়নি দাবি করেন এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করতে এক সপ্তাহ সময় লাগবে। পরে বলা যাচ্ছে কৃষি বিভাগে ক্ষতি কী পরিমাণ।

বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ইয়ামিন চৌধুরী বরিশালটাইমকে জানান, ঘূর্ণিঝড়ে সম্ভব্য ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়নে স্ব-স্ব জেলার কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সফলের ক্ষতিসহ সাতজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত তালিকা হাতে আসলে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে, বলেন তিনি।’

পাঠকের মতামত...

Total Page Visits: 6 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*