নিজস্ব প্রতিবেদক // শিক্ষা কার্যক্রম চালুর অনুমতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন কয়েকটি উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এমপিওভুক্তি না হওয়া, শিক্ষক সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও স্থানীয় বিরোধসহ নানা কারণে একে একে থেমে গেছে এসব কলেজের কার্যক্রম। বর্তমানে এমন আটটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে চলতি শিক্ষাবর্ষে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কোনো শিক্ষার্থীই ভর্তি হয়নি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সারাদেশে ১০টি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানই বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই কার্যত কয়েক বছর ধরে অচল। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের অনুমতি চেয়ে বোর্ডে আবেদনও করেছে।
শিক্ষার্থীশূন্য ওই আট প্রতিষ্ঠান হলো, বরগুনা সদর উপজেলার দক্ষিণ মনসাতলীর বরগুনা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, বেতাগীর কদভানু মেমোরিয়াল সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির পূর্ব জালাবাড়ি আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সেহাঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পটুয়াখালী সদরের পাজাখালী কলেজ, গলাচিপার পানপট্টি কলেজ এবং কাউখালীর ইজিএস শিক্ষা নিকেতন।
এর মধ্যে পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। অন্য তিনটি শুরু থেকেই কলেজ হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি সমস্যা ছিল শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তি। নিয়মিত বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষক অন্যত্র চলে যান। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কোথাও শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে, কোথাও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়।
বেতাগীর কদভানু মেমোরিয়াল সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ ২০১৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক শামীমা নাসরিন জানান, প্রতি বছর বিদ্যালয় থেকে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করলেও কলেজ শাখা পরিচালনায় শ্রেণিকক্ষের সংকট ছিল। এ কারণে ২০২৪ সালের পর সেখানে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি বন্ধ করা হয়।
তবে স্থানীয়ভাবে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন বিদ্যালয়ের কাছেই একটি ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এতে এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ওই কলেজে ভর্তি হওয়ায় কদভানু প্রতিষ্ঠানের উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন।
ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজেও প্রায় একই ধরনের সংকট দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়।
সদ্য অবসর নেওয়া প্রধান শিক্ষক জলিলুর রহমান জানান, আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে কলেজে পাঠদান করতেন। এমপিও না হওয়ায় ধীরে ধীরে তারা কলেজের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে কলেজের ক্লাস চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের পর আর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়নি।
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির সেহাঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে নাজুক। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান জানান, স্থানীয় এক ব্যবসায়ী একেএম শামসুদোহা ফারুকের উদ্যোগে উচ্চ মাধ্যমিক কার্যক্রম চালু হয়েছিল। কিন্তু বোর্ডের পাঠদান অনুমতি ছাড়া আর তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়া যায়নি।
কলেজ পরিচালনার ব্যয় বহন করতে গিয়ে একপর্যায়ে ওই দাতা সরে দাঁড়ান। এরপরই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় চার বছর ধরে সেখানে কলেজ পর্যায়ে পাঠদান নেই। সর্বশেষ ২০২৪ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় দুজন অংশ নিয়ে একজন উত্তীর্ণ হন।
একই উপজেলার পূর্ব জালাবাড়ি আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজেও দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মাধ্যমিক কার্যক্রম অনিয়মিত। প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় কুমার এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি না হলেও জানান, প্রায় তিন দশক আগে কলেজ পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল এবং মাঝেমধ্যে তা বন্ধও ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মোট ২১১ জন অংশ নিয়ে ১৫৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থী ছিলেন ছয়জন।
কাউখালীর ইজিএস শিক্ষা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক তানভীর আহমেদ কলেজ শাখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে স্থানীয় বিরোধকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, একটি পক্ষ এলাকায় প্রচার চালিয়ে শিক্ষার্থীদের সেখানে ভর্তি না হওয়ার জন্য প্রভাবিত করে। পরে ওই পক্ষই শিক্ষা বোর্ডে পাঠদান অনুমতি বাতিলের আবেদন করে।
প্রধান শিক্ষক জানান, প্রায় তিন বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার পাজাখালী কলেজ ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মো. আশরাফ আলী দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের একটি অংশের অসহযোগিতার কারণে কলেজটি কার্যত শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে তাবলিগ জামাতে থাকাকালে শিক্ষকদের একটি অংশের কারণে কলেজের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। গত তিন বছর ধরে সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। তবে বর্তমানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুপারিশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা না করলেও শিক্ষা বোর্ডের তথ্যভাণ্ডারে এগুলো এখনও উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে। ফলে প্রতিবছর ভর্তি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে এসব কলেজের নাম চলে আসছে।
এ ব্যাপারে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীশূন্য কলেজগুলোর অতীত পরিস্থিতি সম্পর্কে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে চলতি বছরের ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থী না পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।