
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের যুবক মামুন হাওলাদার প্রায় দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম কারাগারে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বন্দী। তবে পরিবারের দাবি, তিনি পরিকল্পিত হত্যার নেপথ্যের ব্যক্তি নন; বরং পরিস্থিতির শিকার হয়ে আত্মরক্ষার্থে সংঘটিত ঘটনায় এখন হত্যার দায় বহন করছেন।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট গভীর রাতে চট্টগ্রামের ইপিজেড থানাধীন বন্দরটিলা শাহ আলী মসজিদসংলগ্ন সাইটপাড়া এলাকায়। নিহত হন বাগেরহাট সদর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের খান মেহেদী হাসান (২৪)। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া জি.আর-৯৪/২০২৪ নম্বর মামলায় একমাত্র আসামি করা হয় মামুন হাওলাদারকে।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় সূত্র, মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে—ঘটনার পেছনে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, সম্পত্তিগত বিরোধ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতাকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়।
মামুন আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, নিহত মেহেদী হাসানসহ কয়েকজন তার স্ত্রীকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে আত্মরক্ষার্থে তিনি নিহতের হাত থেকে ছুরি নিয়ে পাল্টা আঘাত করেন। সেই আঘাতেই মেহেদীর মৃত্যু হয় বলে দাবি করেন তিনি।
একাধিক আইনজীবীর মতে, যদি জবানবন্দির বর্ণনা সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি দণ্ডবিধির ১০০ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকারের আওতায় পড়তে পারে। তারা বলছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে নতুন তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঘটনার কিছুদিন পর মামুনের স্ত্রী রিয়া মনি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে তালাকের নোটিশ পাঠান। বিষয়টিকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখছেন মামুনের পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন।
মামুনের বাবা অভিযোগ করে বলেন, “আমার ছেলে গরিব ঘরের হওয়ায় সঠিক আইনি সহায়তা পায়নি। শুধু তাকেই আসামি করা হয়েছে। অথচ ঘটনার সঙ্গে আরও লোক জড়িত ছিল।”
স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘটনার রাতে মামুনকে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছিল। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে না পৌঁছালে তাকেও হত্যা করা হতে পারত।
এদিকে মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শেখ তরিকুল ইসলাম বলেন, “আমি তদন্তে যা পেয়েছি তাই উপস্থাপন করেছি। পরবর্তীতে চার্জশিট প্রদানকারী কর্মকর্তা বিষয়গুলো যাচাই করার সুযোগ পেয়েছেন।”
চার্জশিট দাখিলকারী কর্মকর্তা এসআই আরিফ হোসেন বলেন, “মামলাটি আমি পরে পেয়েছি। আগের তদন্তকারী কর্মকর্তা অধিকাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছিলেন।”
বরিশাল জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. বেলাল হোসেন বলেন, “ঘটনার নথিপত্র পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে এটি শুধুমাত্র সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। এখানে আত্মরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অধিকতর তদন্ত হলে আরও ব্যক্তির সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসতে পারে।”
তিনি জানান, জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মামলার বাদী একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোন কেটে দেন বলে প্রতিবেদকের দাবি। নিহতের বাবা সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।