নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বয়স প্রায় আট বছর। কিন্তু শারীরিক গঠন আর আচরণে তাকে মনে হয় দুই বছরের একটি শিশু। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, হাঁটতে পারে না, বলতে পারে না মনের কথাও। ক্ষুধা, কষ্ট কিংবা আনন্দ কোনোটাই ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই তার। নীরব দৃষ্টিতে শুধু চারপাশের পৃথিবীটাকে দেখে যায় সে।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট পৌরশহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রসুনপুর এলাকার দিনমজুর রাজু মিয়া ও আতিকা খাতুন দম্পতির ছেলে আয়াত। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে মেজো। জন্মের পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। অভাবের সংসারে নিয়মিত চিকিৎসাও করানো সম্ভব হয়নি। ফলে বয়স বাড়লেও থেমে আছে তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা।
আয়াতের মা আতিকা খাতুনের দিন-রাত কাটে সন্তানকে আগলে রেখে। কথা বলতে বলতে বারবার ভিজে ওঠে তার চোখ।
তিনি বলেন, যখন দেখি অন্য বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে, তখন বুকটা হুহু করে ওঠে। আমার ছেলেও তো ওদের মতো হতে পারত। কিন্তু ও শুধু তাকিয়ে থাকে। কী বলতে চায়, কী কষ্ট পায়, কিছুই বুঝতে পারি না। আট বছর হয়ে গেল, আজও কোলে করে রাখতে হয়। কখনো কোথাও যেতে পারি না। শুধু একটা স্বপ্ন দেখি, যদি একবার ‘মা’ বলে ডাকত!
সম্প্রতি উপজেলা চত্বরে নানি সুলতানা বেগমের কোলে দেখা যায় আয়াতকে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধা এখনও অক্লান্ত ভালোবাসায় নাতিকে বয়ে বেড়ান।
কণ্ঠে ক্লান্তি, চোখে মমতা নিয়ে তিনি বলেন, ছোট থাকতে কোলে নিতে কষ্ট হতো না। এখন বড় হয়ে গেছে, ওজনও বেড়েছে। তারপরও কোলে নিয়েই চলতে হয়। নাতির মুখের দিকে তাকালে সব কষ্ট ভুলে যাই।
স্থানীয় বাসিন্দা রাহাদ বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই ওকে এমন অবস্থায় দেখে আসছি। বয়স বাড়ছে, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না। পরিবারটাও খুব অসহায়। একটা হুইলচেয়ার পেলেই তাদের অনেক উপকার হতো।
প্রতিবেশী এক নারী বলেন, সমবয়সী বাচ্চারা যখন খেলাধুলা করে, আর আয়াত শুধু তাকিয়ে থাকে, তখন খুব কষ্ট লাগে। আল্লাহ যেন শিশুটার কষ্ট কিছুটা হলেও কমিয়ে দেন।
ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সোলায়মান মেহেদী হাসান জানান, জন্মগত নানা জটিলতার কারণে অনেক শিশু এমন অবস্থার মুখোমুখি হয়।
তিনি বলেন, এ ধরনের শিশুদের মধ্যে সেরিব্রাল পালসি বা ডাউন সিনড্রোমের মতো সমস্যা থাকতে পারে। জন্মের সময় অক্সিজেনের ঘাটতি, গর্ভকালীন জটিলতা কিংবা অন্যান্য কারণেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি উপকারী হলেও নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল ব্যাখ্যার চেয়ে আয়াতের পরিবারের চাওয়া অনেক ছোট। তারা কোনো বিলাসী জীবন চায় না। তাদের একমাত্র আকুতি একটি হুইলচেয়ার। একটি হুইলচেয়ারই হয়তো আয়াতের চলাফেরাকে কিছুটা সহজ করবে, কমাবে মা ও নানির কষ্ট।
মানবিক কোনো হাতের স্পর্শে যদি আয়াতের পাশে দাঁড়ানো যায়, তবে তার জীবনেও হয়তো যোগ হবে সামান্য স্বস্তি, একটু আলো আর বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাছুদ রানা জানান, শিশুটির জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থাও করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল আল-মামুন কাওসার শেখ বলেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিশুটির জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।