
এক সময় উচ্চ রক্তচাপের রোগী প্রধানত শহরকেন্দ্রিক হলেও নগরায়ণের প্রভাবে এখন গ্রামেও বাড়ছে এ ধরনের রোগী। গবেষণা ও বিভিন্ন জরিপের বরাত দিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ জীবনে হাঁটা-চলার প্রবণতা কমে যাওয়া এবং প্রক্রিয়াজাতকৃত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের কারণে গ্রামে উচ্চ রক্তচাপের রোগী বাড়ছে। শুধু এর বিস্তারই নয়, স্থানীয় পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধার অভাবে রোগটি দেরিতে শনাক্ত হচ্ছে এবং তা আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয়ে এখনো ভরসা উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতাল।
গত চার দিন ধরে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট (এনআইসিভিডি) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নরসিংদীর মনোহরদীর ইয়াফেস রহমান (৫৪)। গত মঙ্গলবার তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে ইয়াফেসের প্রায় সময় মাথা ঘোরা ও মাথা ব্যথা হতো।
গত বুধবার হাসপাতালে কথা হয় ইয়াফেসের ছেলে তুহিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘প্রায় দুই বছর ধরে অল্পতেই অস্থির হয়ে যেতেন আব্বা। বাড়ির পাশে কমিউনিটি ক্লিনিকে নিলে রক্তচাপ মেপে উচ্চ রক্তচাপের কথা বলা হয়। কিন্তু সেখানে পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় শহরে নিতে বলে। পরে গত মঙ্গলবার হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর শুরুতে জেলা সদর হাসপাতালে পরে অবস্থা খারাপ হওয়ায় এখানে এনেছি।’
শুধু ইয়াফেস নন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৭ শতাংশ তথা চার কোটি মানুষ ভুগছেন উচ্চ রক্তচাপে। যাদের বড় অংশই গ্রামাঞ্চলের। তবে শহর কিংবা গ্রাম সিংহভাগই জানেন না, তারা এই নীরব ঘাতকের শিকার। আর যখন জানতে পারেন, তখন হৃদরোগসহ নানা জটিলতা নিয়ে আসেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
চিকিৎসকরা বলছেন, শহরাঞ্চলে চলাচলের পথ সীমিত হওয়ায় বেশিরভাগ সময়ে যানবাহন ব্যবহার করছে মানুষ। আর যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় গ্রামাঞ্চলেও কম দূরত্বের পথেই বাহন ব্যবহার প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে সেখানেও ক্রমেই অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের প্রভাব পড়ছে। এতে করে অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান ও মাদকের প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে কমছে শারীরিক পরিশ্রম।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ক বৈশি^ক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশে^র ৩০-৭৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ত্রিশ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ১৩০ কোটি। এর মধ্যে ৭৮ শতাংশই বসবাস করে বাংলাদেশসহ নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বাংলাদেশে এই চিত্র খুবই উদ্বেজনক বলে মন্তব্য ডব্লিউএইচওর। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে আক্রান্তদের ৫৬ শতাংশই তাদের উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জানে না। আক্রান্ত হলেও চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার খুবই কম, মাত্র ৩৮ শতাংশ চিকিৎসা নিচ্ছে, এর মধ্যে নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ ৮৫ শতাংশেরই ওষুধ সেবনের পরও রোগটি নিয়ন্ত্রণে নেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মারা যায়, যার ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা নেই সরকারের হাতে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। সংখ্যায় যা চার কোটির বেশি। এর মধ্যে অতিরিক্ত ওজন রয়েছে এমন নারী এবং পুরুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার হার যথাক্রমে ৪৯ শতাংশ এবং ৪২ শতাংশ, যেখানে স্বাভাবিক ওজনের নারী এবং পুরুষের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ২৫ শতাংশ এবং ২৪ শতাংশ।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, প্রতি ১০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ৭টিতে উচ্চ রক্তচাপজনিত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। তবে নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন রয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশে।
গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ স্টাডি (জিবিডি) ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ মোকাবিলায় সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের (সিসিএইচএসটি) কমিউনিটি ক্লিনিকে ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা হালনাগাদকরণ কমিটির গত ১৪ মে অনুষ্ঠিত সভায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের জন্য এমলোডিপিন ৫ মিলিগ্রাম ও ডায়াবেটিসের জন্য মেটফরমিন ৫০০ মিলিগ্রাম সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সিদ্ধান্তকে তৃণমূল পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ঠেকাতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ (অসংক্রামক) শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন আমাদের সময়কে বলেন, ‘নগরায়ণের ফলে বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপের রোগী শহর এবং গ্রামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও হাঁটা-চলার প্রবণতা কমে গেছে। বার্গার, হাই এনার্জি ড্রিংকস থেকে শুরু করে অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো এখন গ্রামের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে এখন পর্যন্ত ৩৩৪টি মডেল এনসিডি কর্ণার করা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে ডায়াবেটিস ও প্রেশারের ওষুধ প্রদানের সঙ্গে ব্লাড প্রেশার ও সুগার মাপা যাচ্ছে। তবে সেখানে ডায়াগনোসিস করা হচ্ছে না। সে পর্যায়ে যেতে আলাদা লোকবল লাগবে।’
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের এপিডেমিওলোজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘শুধু নগরায়ণ নয়, গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। এতে করে দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তনে এসেছে। ক্যালোরি বেশি খাচ্ছে ফলে ওজন বাড়ছে। গ্রামেও প্রসেসড ফুড (প্রক্রিয়াজাত খাবার) খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, সঙ্গে আছে মাত্রাতিরিক্ত লবণ খাওয়া। রাস্তাঘাটসহ সবকিছুর উন্নতি হওয়ায় মানুষ হাঁটা-চলা কমিয়ে দিয়েছে, অল্প দূরত্বের পথেও বাহন ব্যবহার করছে। এতে করেই বাসা বাঁধছে উচ্চ রক্তচাপ।’
তবে এই অধ্যাপক বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে রক্তের চাপ মাপার ব্যবস্থা থাকলেও নেই স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা। আবার যতটুকু আছে তার সম্পর্কে অনেকে জানে না। ফলে আক্রান্ত হলেও শনাক্তকরণে এখনো ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল ও বিভাগীয় মেডিক্যাল। পাশাপাশি বেশিরভাগ ক্লিনিকে মাপার যন্ত্র সক্রিয় না থাকায় অনেক সময় তারা রেফার করতে পারে না। এগুলোতে এখনো অনেক কাজ করা বাকি আছে।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।