নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন চরাঞ্চলের শ্রমজীবী নারীরা।
তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করার ফলে নারীদের মাথা ঘোরা ও অতিরিক্ত দুর্বলতার পাশাপাশি জরায়ুজনিত ইনফেকশন এবং ত্বকের নানাবিধ জটিল রোগ প্রকট আকার ধারণ করছে। মূলত অসচেতনতা ও লোকলজ্জার কারণে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, গরমের এই সময়ে চরের নারীদের মধ্যে মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই) এবং বিভিন্ন চর্মরোগের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। চরের বাতাসে বালুকণা বেশি থাকা এবং তীব্র রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়ার কারণে চুলকানি, লাল দানা ও একজিমার প্রকোপ বাড়ছে।
কাপড়ের ব্যবহার ও গোপনীয়তার ঝুঁকি
চিকিৎসকরা জানান, চরের বেশিরভাগ নারী সুতি কাপড় ব্যবহার করেন। এই কাপড় ব্যবহারের পর পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে খুব ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। অনেক সময় লোকলজ্জার ভয়ে চরের নারীরা ভেজা কাপড় ঘরের কোণে বা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে জায়গায় লুকিয়ে শুকান। এতে কাপড়ে মারাত্মক জীবাণু ও ছত্রাক জন্মায়। তাই কাপড় অবশ্যই সরাসরি সূর্যের আলোতে কড়া করে শুকাতে হবে।
একটি সুতি কাপড় ধুয়ে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ বার ব্যবহার করা যাবে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্ন করতে ক্ষারযুক্ত কাপড়ের সাবান বা অতিরিক্ত সুগন্ধি সাবান ব্যবহার করা যাবে না। এতে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ইনফেকশন বাড়ে। এর পরিবর্তে শুধু পরিষ্কার কুসুম গরম পানি বা হালকা নিমপাতা সেদ্ধ পানি ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।
জরায়ু ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি
তীব্র গরমের সাথে নারীদের জরায়ু ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কের বিষয়ে চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ভায়া ইনচার্জ মোছা. শারমিন সুলতানা জানান, অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হয়। চরের নারীরা যখন দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করেন, তখন প্রজনন অঙ্গের চারপাশ ঘামে ভেজা থাকে। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও গরমে সেখানে ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এছাড়া চরে কাজ করার সময় দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা বা পিরিয়ডের সময় অপরিচ্ছন্ন ভেজা কাপড় ব্যবহারের কারণে জীবাণু সহজেই জরায়ুর মুখে এবং মূত্রনালিতে প্রবেশ করে। এর ফলে জরায়ুতে ইনফেকশন, পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ, অতিরিক্ত সাদা স্রাব ও তীব্র চুলকানির সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিলমারী হাসপাতালে গেল মে মাসে জরায়ু সংক্রান্ত প্রাথমিক পর্যায়ের সেবা নিয়েছেন ১৬ জন এবং চলতি জুন মাসের প্রথম ১০ দিনেই চিকিৎসা নিয়েছেন ১১ জন।
চরের বাস্তবচিত্র ও ভোগান্তি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার চিলমারী, নয়ারহাট ও অষ্টমীরচর এলাকায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এই তীব্র গরমে আবাদি জমিতে দীর্ঘ সময় কাজ করছেন। ফলে তারা দ্রুত পানিশূন্যতায় ভুগছেন, যা তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
চিলমারী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বাসিন্দা মিমি খাতুন (ছদ্মনাম) বলেন, এমনিতেই গরমে চরের বালু দিয়া হাঁটা যায় না, তার ওপর পেটের ব্যথায় টিকতে পারি না। লজ্জায় এসব কথা কাউকে বলাও যায় না। গরম বাড়ার পর থেকে শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে গেছে, মাঝে মাঝেই চোখ অন্ধকার হয়ে আসে।
একই এলাকার রুপা খাতুন (ছদ্মনাম) বলেন, সারাদিন মাঠে কাজ করতে হয়। প্রচণ্ড গরমে শরীর ভিজে থাকে, অনেক সময় কাপড় পরিবর্তন করার সুযোগও পাই না। কয়েকদিন ধরে চুলকানি ও জ্বালাপোড়ার সমস্যা বাড়ছে। কিন্তু সংসারের কাজের চাপে চিকিৎসকের কাছেও যাওয়া হয় না।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও হাসপাতালের বক্তব্য
চলতি জুন মাসের প্রথম ১০ দিনে কুড়িগ্রাম জেলায় গড় তাপমাত্রা ছিল ৩০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময়ে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪.৫ ডিগ্রি এবং গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৭১ শতাংশ।
আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক শামছুদ্দোহা জানান, বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলায় সর্বোচ্চ আর্দ্রতার (হিউমিডিটি) পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত থাকছে। ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় মানুষের শরীরে গরমের অনুভূতি অনেক বেশি হচ্ছে এবং রাতেও গরম কমছে না। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না, যার ফলে অস্বস্তি ও গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়।
স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মো. বেলাল হোসেন এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এসএসিএমও জিয়াউল হক জানান, চলমান তাপপ্রবাহের কারণে চরাঞ্চলের নারীদের মধ্যে জরায়ু ও ত্বকজনিত সমস্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অনেক নারী লজ্জার কারণে শুরুতে চিকিৎসা নিতে চান না। তাই তাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. প্রান্ত সরকার বলেন, তীব্র গরমে চরের নারীদের সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিত। প্রজনন স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে শরীর সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার নিরাপদ পানি বা প্রয়োজনানুযায়ী স্যালাইন পান করতে হবে। এই গরমে অতিরিক্ত ঘাম এবং দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় পরে থাকার কারণে কুচকি, বগল এবং আঙুলের ফাঁকে ছত্রাকজনিত (ফাঙ্গাল) ইনফেকশন হচ্ছে। ঘামগ্রন্থি বন্ধ হয়ে চামড়ায় লাল লাল দানা উঠছে, যা তীব্র চুলকানি ও জ্বালাপোড়া তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, মাঠে কাজের পর শরীর ভালো করে মুছে শুকনা রাখতে হবে এবং ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলে ফেলা জরুরি। দিনে অন্তত একবার পরিষ্কার পানিতে এক চামচ লবণ মিশিয়ে অথবা সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করতে হবে। চরের নলকূপের পানিতে অনেক সময় আয়রন বা বালুকণা থাকে। পানি পরিষ্কার করতে এক কলসি পানিতে সামান্য ফিটকিরি দিয়ে ২-৩ ঘণ্টা রেখে দিলে ময়লা নিচে থিতিয়ে পড়বে। পরে ওপর থেকে পরিষ্কার পানি ছেঁকে ব্যবহার করা যাবে। তবে গোসলের সময় আক্রান্ত জায়গায় অতিরিক্ত ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।