
নিজস্ব প্রতিবেদক // বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের ছয় জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১৯ জন। তাদের মধ্যে ৭৩ জনই পিরোজপুরের। অর্থাৎ এক দিনে বিভাগে ভর্তি হওয়া নতুন রোগীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পিরোজপুরের।
শনিবার (৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত পিরোজপুরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ১৩৪ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৯৫১ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১৮২ জন। এ বছর জেলায় ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় পিরোজপুরে ৭৩ জন ভর্তি হওয়ার বিপরীতে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৬২ জন। ফলে এক দিনে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ১১ জন। নতুন রোগী ভর্তির দিক থেকে পিরোজপুরের পরেই বরিশাল জেলা। সেখানে ৬০ জন ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া বরগুনায় ২৯, পটুয়াখালীতে ২৫, ঝালকাঠিতে ১৯ এবং ভোলায় ১৩ জন ভর্তি হয়েছেন।
কেন পিরোজপুরে রোগী বেশি, নিশ্চিত নয়
পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দীর্ঘদিন ধরেই বেশি। জেলার সদর হাসপাতালসহ সাত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সদর হাসপাতালে ৪৪ জন, নাজিরপুরে ৫, নেছারাবাদে ৮, কাউখালীতে ৩, ভান্ডারিয়ায় ৮, মঠবাড়িয়ায় ২ এবং ইন্দুরকানিতে ৩ জন চিকিৎসাধীন।
তবে এই হিসাব শুধু সরকারি হাসপাতালের। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা এতে অন্তর্ভুক্ত নন। ফলে পিরোজপুরে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ ও কচুয়া এলাকার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরাও পিরোজপুরে চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে জেলার বাইরের রোগীরাও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন।
পিরোজপুরে ডেঙ্গু কেন তুলনামূলক বেশি, এর সুনির্দিষ্ট কারণও এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। কর্মকর্তারা বলছেন, এডিস মশার প্রজনন, পরিবেশগত পরিস্থিতি ও মানুষের চলাচলসহ একাধিক বিষয় এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোন কারণটি বেশি প্রভাব ফেলছে, তা জানতে আরও পর্যালোচনা প্রয়োজন।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পিরোজপুরে চিকিৎসা নিতে আসছেন। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন, পৌরসভাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। হাসপাতালের আশপাশেও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে।
রোগীর চাপ, সেবার পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ
রোগীর সংখ্যা বাড়ায় সীমিত জায়গায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে হাসপাতালগুলোতে। কয়েকজন রোগী ও স্বজনের অভিযোগ, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি রয়েছে।
শহরের শেখবাড়ি এলাকার তানভীর চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁর অভিযোগ, ডেঙ্গু কর্নারে ময়লা ও পোকামাকড় রয়েছে। চিকিৎসকের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও সন্তুষ্ট নন তিনি।
তবে জিয়ানগরের পত্তাশী এলাকার মো. জুয়েলের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত তাঁর মাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ওষুধ, জনবল ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক রয়েছে। তবে হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন শ রোগী ভর্তি থাকায় সবাইকে সামাল দিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। নতুন ভবনের কাজ শেষ হলে চিকিৎসাসেবা আরও বাড়ানো যাবে।
বিভাগে চিকিৎসাধীন ৬৯৫
বরিশাল বিভাগে বর্তমানে ৬৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ২৪৩, পিরোজপুরে ১৮২, বরগুনায় ৯৬, পটুয়াখালীতে ৮১, ভোলায় ৫৭ এবং ঝালকাঠিতে ৩৬ জন।
চলতি বছর এ পর্যন্ত বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২ হাজার ২৫৭ জন। সুস্থ হয়েছেন ১১ হাজার ৫৪৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝালকাঠির রাজাপুরের বাসিন্দা সমির (৫৮) ১৮ সেপ্টেম্বর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে চলতি বছর বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯।
বরগুনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে আছে। অনেক বাসাবাড়িতেও পানি ধরে রাখা হচ্ছে। মশার বংশবিস্তারের অনুকূল এমন পরিবেশ থাকলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জোরালো উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। ওই বছর জেলায় ৯ হাজার ৫৩৪ জন আক্রান্ত হন এবং ১৫ জন মারা যান। পরে জেলা প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে মশা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়। এবার সেখানে গত বছরের মতো ব্যাপক সংক্রমণ দেখা যায়নি।
চিকিৎসকদের মতে, পিরোজপুরের পরিস্থিতি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। বরগুনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পিরোজপুরেও এখনই সমন্বিত মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশতাক হোসেন বলেন, পিরোজপুরে এখন পর্যন্ত বরগুনার মতো মশা নিয়ন্ত্রণে জোরালো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শহরের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে আছে এবং মানুষ বৃষ্টির পানি ধরে রাখছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।