বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কয়েক দশকের মধ্যে নগরীর অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে। ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, শুধু ভবন নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে ভূ-উপরিভাগের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে সামান্য উচ্চতার জোয়ারেও বরিশালের বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, নগরীর মাটির স্তর প্রতিবছর গড়ে ১.৬৬ মিলিমিটার নেমে যাচ্ছে। বছরের ভিত্তিতে এই হার ওঠানামা করছে; সর্বাধিক পতনের রেকর্ড এক বছরে ২৪.১৭ মিলিমিটার, যা প্রায় এক ইঞ্চি। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত জলাশয় ভরাটের কারণেও মাটির স্তরের পরিবর্তন হচ্ছে।
মাটির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দুটি বিষয়কে দায়ী করেছেন। একটি হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অন্যটি ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন। ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কারণে মাটির অভ্যন্তরীণ স্তরে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, যা পূরণ করতে উপরের মাটি বসে যাচ্ছে। ফলে নগরী ও আশপাশের এলাকা ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথমে স্যাটেলাইট ইমেজে ভবনের উল্লম্ব বিচ্যুতি ধরা পড়ে। পরে সরেজমিনে গিয়ে তারা দেখতে পান, নতুন নির্মিত বহুতল ভবনও সামনের দিকে হেলে পড়েছে। হেলে পড়া ভবনের প্রমাণ শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে নগরীর বৌদ্ধপাড়ার বিএম কলেজ এলাকা, বটতলা ও করিম কুটির।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান জানিয়েছেন, আগে নিরাপদ পানি পাওয়া যেত ৭০০-৮০০ ফিট গভীরে, এখন তা পাওয়া যায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ ফিট গভীরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, গ্রীষ্মকালে পানির স্তর ৩০-৪০ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে, যেখানে ৮-১০ বছর আগে ১৫-২০ ফিটেই পানি পাওয়া যেত।
মানবাধিকার কর্মী মুরাদ আহম্মেদ বলেন, ‘বর্তমান হার আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটা ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে। ৫০-১০০ বছরের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে শহরের ভূ-উপরিভাগ সমান হয়ে গেলে সামান্য জোয়ারেও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে।’
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও জনসুরক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘বরিশালকে সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনাই একমাত্র উপায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা, নদী, খাল ও পুকুরের পানি ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিশোধনের ব্যবস্থা করা, অবৈধ-অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা, নগর এলাকার পানি স্তর পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর জোড় দিতে হবে। যদি এসব পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে দক্ষিণ উপকূলীয় বিভাগীয় এই শহর ভবিষ্যতে বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।’
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘প্রকৃতির আচরণ কখন কী রকম হবে তা বলা মুশকিল। তবে আমরা যা পেয়েছি, তা হলো মাটি স্থিরভাবে নেমে যাচ্ছে। এ জন্য এখন থেকেই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সীমিত করতে হবে। সারফেস পানি ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এতে হয়তো এই বিপদ ঠেকানো সম্ভব হবে।’ সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে একদিন শহরটি বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
