এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট // চারদিকে থইথই বৃষ্টির পানি। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান জল। সেই পানির মাঝখানে বাঁশের খুঁটি ও কাঠের পাটাতনের ওপর কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে একটি জরাজীর্ণ বসতঘর। বৃষ্টির পানিতে খুলে পড়ছে ঘরের বেড়া, নড়বড়ে হয়ে গেছে খুঁটি। স্যাঁতসেঁতে মেঝেজুড়ে কিলবিল করছে কেঁচো ও নানা পোকামাকড়, মাঝেমধ্যেই ঘরে ঢুকে পড়ছে সাপ-ব্যাঙ। ভয়, অনিশ্চয়তা আর চরম কষ্টকে সঙ্গী করেই প্রতিটি দিন পার করছেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের সাবেক সংরক্ষিত মহিলা সদস্য দীপ্তি মজুমদার (৬০)।
সোমবার (৬ জুলাই) বিকেলে নিজ বাড়িতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দীপ্তি মজুমদার বলেন, ২০১২ সালে স্বামী ক্ষিরোদ চন্দ্র মজুমদারের মৃত্যুর পর তিনি কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েন। স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির ন্যায্য অংশও পাননি। মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে একমাত্র মেয়ে সিনিগ্ধাকে লেখাপড়া করিয়েছেন এবং ২০১৩ সালে তার বিয়ে দিয়েছেন।
তিনি জানান, ২০১৬ সালে এলাকাবাসীর অনুরোধে সন্তোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। টানা পাঁচ বছর জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করলেও নিজের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নেননি। মানুষের সমস্যা সমাধান, সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। অথচ আজ সেই জনপ্রতিনিধিকেই মানবেতর পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছে।
দীপ্তি মজুমদারের অভিযোগ, প্রভাবশালীরা তাঁর বাড়ির চারপাশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করায় জমি নিচু হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বসতঘর ও রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যায়। রান্নাঘরটি এখন প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী। একই ঘরে রান্না, খাওয়া ও বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে সাপ, ব্যাঙ ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রব তাঁর জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন মানুষের পাশে থাকা একজন সাবেক জনপ্রতিনিধির এমন অসহায় জীবনযাপন অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁরা দ্রুত নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা, বাড়ির চারপাশের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জায়গা সংস্কারে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বলেন, “গত ১ জুলাই সন্তোষপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ভাঙা রাস্তা পরিদর্শনে গিয়ে দীপ্তি মজুমদারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি ইউনিয়ন পরিষদের সচিবকে পাইপ বসিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছি।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, শুধু অস্থায়ীভাবে পানি সরিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? মানুষের সেবায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করা এই সাবেক জনপ্রতিনিধির জন্য একটি নিরাপদ বাসস্থান ও স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।