
নিজস্ব প্রতিবেদক // ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের দপদপিয়া সেতুর টোল প্লাজা থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের অংশটি প্রায় দেড় কিলোমিটার। এর পুরোটাতে বড় বড় গর্ত। গত মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা গেছে, ইট দিয়ে গর্ত ভরাটের চেষ্টা করছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কর্মীরা। কিছুদিন আগেও এমন চেষ্টা হয়েছিল। বৃষ্টিতে তা বেশিদিন টেকেনি।
বরিশাল মহানগরীর দক্ষিণপাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা কীর্তনখোলার ওপর নির্মিত সেতুটি ঢাকা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ সেতু। এর উত্তর প্রান্তে বরিশাল নগরী, দক্ষিণ প্রান্তে
সেতুর ঢালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণত সেতুর ঢাল দিয়ে নামার সময়ে যে কোনো যানবাহনের গতি বেড়ে যায়। এমনকি ইঞ্জিন বন্ধ রাখলেও যানবাহন দ্রুতগতিতে চলে। এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় দপদপিয়া সেতুতে। এই সেতুর ঢালে নামার সময়ে চালককে ব্রেক কষে হেলেদুলে চলতে হয়। একটু অসতর্ক হলে গর্তে পড়ে উল্টে যায় যানবাহন।
মহাসড়কের এ অবস্থা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভের শেষ নেই। গত ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে দপদপিয়া সেতুর ওপর খানাখন্দের ছবি তোলার সময় কুয়াকাটাগামী বাসের ভেতর থেকে এক যাত্রী বলে ওঠেন, ‘ভাই ভালো কইর্যা তোলেন, হালাগো একটু (ছাপার অযোগ্য) দিয়ে দেন।’
বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটের সৌদিয়া পরিবহনের চালক মো. রায়হান প্রতিদিন একবার যাত্রীবাহী বাস নিয়ে আসা-যাওয়া করেন। তাঁর ভাষ্য, বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়ার পর ভাঙ্গা পর্যন্ত পৌঁছাতে আগে ২ ঘণ্টা সময় লাগত। চলতি বছর সড়কের কারণে সময় লাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা। কেউ আগে যাওয়ার চেষ্টা করলে যাত্রীসহ বাস নিয়ে সড়কের পাশের পুকুরে অথবা গাছের ওপর আছড়ে পড়ে। এমন দুর্ঘটনা প্রায় প্রতিদিন ঘটছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আশপাশের এলাকাবাসীর অভিযোগ, খানাখন্দের কারণে প্রায়ই মহাসড়কের এ অংশে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। গত এক মাসে প্রায় পাঁচটি থ্রি-হুইলার উল্টে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত গত ৯ আগস্ট দপদপিয়া সেতুতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তখন শিক্ষার্থীরা সংস্কারের দাবি জানিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিলেন। আন্দোলন নিবৃত্ত করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সওজ। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করায় ক্ষুব্ধ একদল শিক্ষার্থী গত মঙ্গলবার সওজ দপ্তরে যান। এ সময় তারা নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামকে নানা কটূক্তিও করেন।
শিক্ষার্থী মো. রাজীব বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী ১০ অক্টোবরের মধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ করে রাস্তার দুই পাশে ফুটপাত নির্মাণের কাজ শুরু এবং ১০ নভেম্বরের মধ্যে আরসিসি ঢালাই ও সড়কের পাশে আলোর ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ কাজ তদারকিতে সওজ কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি প্রতিনিধি টিমও গঠিত হয়। তবে এখনও কোনো কাজ শুরু হয়নি, শুরু যে হবে তার কোনো লক্ষণও নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু এই অংশটি নয়, ফরিদপুরের ভাঙ্গার মোড় থেকে মহাসড়কের দুরবস্থা শুরু। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দক্ষিণ দিকে বরিশাল-কুয়াকাটামুখী সড়কে পড়লেই দুর্ভোগের যাত্রা শুরু হয়। ভাঙ্গা থেকে পটুয়াখালীর জেলার সীমানা পায়রা সেতু (লেবুখালী) পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার পর্যন্ত অগণিত খানাখন্দ। এর মধ্যে ভাঙ্গা থেকে গৌরনদী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার অংশের একাধিক জায়গা যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়। অথচ ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এই সড়কে যানবাহন চলাচল কয়েকগুণ বেড়েছে। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামলাতে ১৮ ফুট চওড়া সড়ক ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হয়। অগণিত খানাখন্দের কারণে সেই সড়ক এখন যানবাহন চলাচল অনুপযোগী হয়ে গেছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা এসব তথ্যের সত্যতা স্বীকার করে সমকালকে বলেছেন, গত দুই অর্থবছরে বরাদ্দ নিয়মিত না আসায় সংস্কারকাজ হয়নি। এ বছরের বর্ষায় যার কুফল পাওয়া যাচ্ছে। বর্ষা শেষ না হলে তারা সংস্কার শুরু করতে পারছেন না।
সওজের বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করীম সমকালকে বলেন, মহাসড়কে তাঁর আওতাধীন হচ্ছে কুয়াকাটা থেকে মাদারীপুরের ও বরিশাল জেলার সীমানা ভুরঘাটা সেতু পর্যন্ত ১৬৭ কিলোমিটার। ভুরঘাটা থেকে পটুয়াখালীর পায়রা সেতু পর্যন্ত ভাঙ্গাচোরা সড়ক। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে এ অংশের সংস্কারকাজ শুরু হবে।
অন্যদিকে সওজ গোপালগঞ্জ জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেদ শাহেদ জানিয়েছেন, ফরিদপুরের ভাঙ্গার মোড় থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত তাঁর আওতাধীন ৪৮ কিলোমিটার সড়কের বেশিরভাগ খারাপ। এরই মধ্যে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে ৩৫ কিলোমিটারে সংস্কারের আশা করছেন।
সওজ বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের ভাষ্য, দপদপিয়া সেতুর টোলঘর থেকে ভোলামুখী সড়কের চরকাউয়া জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের দরপত্র গত ১৯ জুলাই সম্পন্ন হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে কাজের মান টেকসই হবে না, তাই শুরু করা হয়নি। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, একইদিন ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড থেকে বার্থি ও বাসস্ট্যান্ড থেকে কাসেমাবাদ পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার করে সংস্কারের দরপত্র সম্পন্ন হয়। বর্ষা শেষ হলে ঠিকাদার কাজ শুরু করবেন। আগামী ঈদযাত্রার আগে শেষ করার আশা করছেন। তিনি স্বীকার করেন, তাঁর আওতাধীন মহাসড়কের ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে অর্ধেক অংশ ব্যবহারের অনুপযোগী। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ না থাকায় বড় আকারে সংস্কার করা যায়নি।