বরিশাল জেলার মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার চর গোপালপুর বাজারে ইলিশ নিয়ে বসেছেন ইব্রাহিম প্যাদা। খুব ভোরে মেঘনা নদী থেকে শিকার করা মাছগুলো কিনে এনেছেন বলে জানান তিনি। প্যাদা বলেন, 'জাইল্যাগোর কাছ থেকে আনছি। বিক্রি কইরা টাকা দিমু। নিষেধাজ্ঞার সময়ে ওরা ক্যামনে নদীতে নামছে জানি না, হয়তো থানা-পুলিশ ম্যানেজ কইরা নামছে।'
ইব্রাহিম প্যাদার কাছ থেকে জেলেদের নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করা হলে অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি নিজেকে জামাল মুন্সী বলে পরিচয় দেন। তিনি জানান, দুই রাতের জন্য ইউনিয়নের এক নেতার মাধ্যমে নদীতে মাছ ধরতে নেমেছেন। পুলিশ-প্রশাসনের ঝামেলা হলে ওই নেতাই সব দেখভাল করেন। তবে কে সেই নেতা, তা তিনি মোবাইলে বলতে রাজি হননি। নদী থেকে ফিরে সামনাসামনি কথা বলবেন বলেও জানান।
জামাল মুন্সী বলেন, 'ইদিকটায় ফিশারি অফিসার বেশি আসে না। লোকাল নেতাগো ম্যানেজ করতে পারলেই সমস্যা হয় না। শুধু তিনি নন, উলানিয়া, কালীগঞ্জ, আলীগঞ্জ, একতার হাটের অনেকেই নদীতে মাছ ধরেন।'
ইব্রাহিম প্যাদা বা জামাল মুন্সীই শুধু নন, বরিশালের নদীতীরবর্তী উপজেলাগুলোতে ইলিশ শিকার ও বিক্রি প্রকাশ্যই। বিপরীতে ইলিশ রক্ষায় অভিযান নগণ্য বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ ফেরিঘাট এলাকায় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস মিয়ার সঙ্গে। ব্যাগে করে এক জোড়া ইলিশ কিনে মুলাদী উপজেলার নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। ইউনুস বলেন, 'ইলিশ নিষেধাজ্ঞা চললেও শত শত জেলে নদীতে মাছ ধরছে। মাছগুলো কেউ না কেউ কিনছে। তাহলে আমি কিনলে দোষ কী?'
তিনি বলেন, 'সারা দিনে একবার হয়তো ফিশারির বোট আসল। তারপর তো সারাদিনে কেউ খোঁজ নেয় না। আসলে অভিযান চলে নামে, বাস্তবে নদীর মাছ ধরা বন্ধ নেই।'
ফেরিতে কথা হয় আরেক ব্যবসায়ী আব্দুস সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'মাছ রক্ষায় নামে মাত্র অভিযান চলছে। সকলেই ইলিশ ধরছে, সকলেই কিনছে, একটু গোপনে। সরকার যদি চায় নদীর মাছ শিকার হবে না। চব্বিশ ঘণ্টায় সব বন্ধ হবে। কিন্তু সরকার তো চাইছে না। সরকার চাইলে মাছ শিকারের সাথে দলেরই লোক জড়িত।'
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাবুগঞ্জ, মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ শুধু নয়, উজিরপুর, বানারীপাড়া ও বাকেরগঞ্জ উপজেলার নদীগুলোতেও প্রকাশ্যে ইলিশ শিকার চলছে।
বাকেরগঞ্জের কারখানা নদীর পাড়ে জেলেদের কাছ থেকে ইলিশ কিনেছেন বরিশাল সদর উপজেলার কর্নকাঠির বাসিন্দা মনির হোসেন। তিনি বলেন, জেলেরা নদীর পাড়েই ইলিশ বিক্রি করছিলেন। দেড় হাজার টাকায় এক কেজি ওজনের ইলিশ, ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার টাকা এবং এর চেয়ে ছোট ইলিশ ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল। তিনি তিন হাজার টাকার মাছ কিনেছেন।
প্রকাশ্যে ইলিশ শিকারের বিষয়ে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিয়াজুর রহমান জানান, বাজারগুলোতে খুব ভোরে মাছ বিক্রি হয় বলে শুনেছেন। সাধারণত রাতের অন্ধকারে উত্তাল নদী পার হয়ে অভিযান চালানো হয় না। এ ছাড়া নদীর এক পার থেকে অন্য পারে যেতেও অনেক সময় লাগে। তারপরও তারা চেষ্টা করছেন। এরপরও মাছ শিকার থামাতে পারছেন না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছিল। তারা বলেছেন, কিন্তু কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না।
মেহেন্দীগঞ্জের মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, 'অভিযানের জন্য আমরা নদীতে নামলেও জেলেরা বেপরোয়া। তারা আমাদের ওপর হামলা করছে। বাধ্য হয়ে কোস্টগার্ডকে ফাঁকা গুলিও ছুড়তে হয়েছে।'
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ৩১৮ কিলোমিটারজুড়ে থাকা এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অভয়াশ্রমটির পাহারায় হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে মৎস্য কর্মকর্তা আছেন মাত্র চারজন। সন্ধ্যার পর নদী ভয়ংকর রূপ নেয়, তখন সেখানে যাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া এবার তাদের বাজেট নেই বললেই চলে। ফলে আগের চেয়ে অভিযানও কম হচ্ছে। তাদের ধারণা, বরিশাল জেলার অসংখ্য বাজারে অবৈধভাবে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। এর বেশির ভাগই হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়।
বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকার বলেন, 'কিছু কিছু স্থানে ব্যত্যয় হচ্ছে। সমন্বিতভাবে আমরা চেষ্টা করছি অসাধু জেলেদের কীভাবে প্রতিহত করা যায়। আমরা অভিযান জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
বরিশাল মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলার ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জন জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
