নিজস্ব প্রতিবেদক // বরিশাল নগরীর পোষাক বাজারে চলছে অভিনব প্রতারণা। পণ্যের বিপরিতে বিপণি-বিতানগুলো ক্রেতা সাধারণের কাছ থেকে ইচ্ছে মতো হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় কোনো কোনো পণ্যসামগ্রী দ্বিগুণ-তিনগুণ মূল্যেও বিক্রি করছে। এনিয়ে বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মধ্যে প্রায়শই বচসা শোনা যাচ্ছে। আবারও কেউ কেউ প্রতারতি হয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার ও সংক্ষরণ অধিদপ্তরের দুয়ারেও কড়া নাড়ছেন বিচার প্রাপ্তির লক্ষে। কিন্তু এর পরেও যেনো অসাধু ব্যবসায়ীদের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। এবার শহরের গীজামহল্লার নামি পোষাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ‘জাহান স্টাইলে’ শার্ট কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হলেন এক তরুণী। ১ হাজার ৪৯০ টাকার শার্টের মূল্য তাঁর কাছ থেকে রাখা হয়েছে ২ হাজার ৫০ টাকা। এনিয়ে সাথে বাকবিতন্ডা এবং পরিশেষে প্রতিষ্ঠানটি চাপের মুখে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দিলেও তরুণীর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ফেসবুক পোস্টে। সেই পোস্টে কয়েক শ নেটিজেন ‘জাহান স্টাইল’ নামক পোষাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানটির কড়া সমালোচনা করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ প্রতারণার শিকার তরুণীকে ভোক্তা অধিকার ও সংক্ষরণ অধিদপ্তরের স্মরণাপণ্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
রাসনা শরিফ নামের তরুণী গত ৮ মার্চ এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ক্ষোভের সাথে তুলে ধরেছেন ‘‘পুরাতন জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়, বরিশাল’’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে। ‘সতর্কতামূলক পোস্ট’ লিখে তরুণী উল্লেখ করেন, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি তাঁর বাবা-মাকে নিয়ে বরিশাল শহরের গীর্জা মহল্লা এলাকার ‘জাহান স্টাইল’ নামক পোষাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে যান একটি শার্ট ক্রয়ের উদ্দেশে। এবং তিনি সেখান থেকে একটি শার্ট চয়েজ করলে সেলসম্যান কোড দেখে মূল্য জানান ২ হাজার ৫০ টাকা। এসময় ৫০ টাকা কম রাখতে বলা হলে ওই সেলসম্যান বলেন এক দরের প্রতিষ্ঠান, দামাদামি করার সুযোগ নেই। পরে তরুণী তাঁর পিতার জন্য ওই ২ হাজার ৫০ টাকা দিয়েই শার্ট ক্রয় করেন।
একদিনের ব্যবধানে অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি তরুণীর পিতা একই প্রতিষ্ঠানে আরেকটি শার্ট কিনতে এসে দেখতে পান আগের দিনে ক্রয় করা অনুরুপ শার্টে ১ হাজার ৪৯০ টাকার একটি ট্যাগ লাগানো আছে। এসময় তরুণীর পিতা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করলে তারা নানা যুক্তিতে বোঝানোর চেষ্টা করে। তবে তিনি কৌশল করে শার্টে লাগানো একটি ট্যাগ খুলে নিয়ে যান।
তরুণী জানান, ওই ট্যাগটি নিয়ে পরদিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় প্রতিষ্ঠানটিতে যান এবং বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়ার পাশাপাশি প্রতিবাদ করেন। এতে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা ক্ষুব্ধ হয়ে তরুণী এবং তাঁর পিতাকে আজে-বাজে কথা বলেন। এমনকি মন-মানসিকতা ঠিক করতে বলেন। কিন্তু তরুণীর জোরালো প্রতিবাদে একটা সময়ে ভরকে যায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
তরুণী তাঁর পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, শার্টের অতিরিক্ত মূল্য ফেরত না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির লোকজন তাদের উল্টা-পাল্টা বোঝাতে থাকেন এবং একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বলে ওঠেন ‘টাকা ফেরত না দিলে কী করবেন’! এসময় তরুণী বিষয়টি নিয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরে যাওয়ার হুমকি দিলে প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা বেকায়দায় পড়তে পারেন- এমন ভাবনায় নমনীয় হয় এবং হাতিয়ে নেওয়া অতিরিক্ত ৫৬০ টাকা দ্রুত ফেরত দেয়।
পোষক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের এই ভাওতাবাজি এবং নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়টি ৮ মার্চ সকাল ৯টা ১১ মিনিটে তাঁর ফেসবুক আইডি দিয়ে ‘‘পুরাতন জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয়, বরিশাল’’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার করেন।
বিভিন্ন মাধ্যম নিশ্চিত হওয়া গেছে- শুধু মাত্র গীর্জামহল্লা এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলোতেই নয়, চকবাজারসহ আশপাশের প্রতিটি বিপনি-বিতানেই চলছে ক্রেতা ঠকানো প্রতিযোগিতা। রাজধানী থেকে কম মূল্যে পোষাক ক্রয় করে এনে বরিশাল নগরীর বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলো যা ইচ্ছে তাই দাম হাকাচ্ছে। আবার কোনো কোনো দোকানি নিম্নমানের পোষাকও চড়া মূল্যে বিক্রি করছে, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে। বিশেষ করে এই চক্রটি আসছে ঈদকে সামনে রেখে এখন বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
পণ্যের দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবিতে আন্দোলন করে আসা এমন একজন ব্যক্তি অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে শহরের বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারিতে রাখলেও এখন আর তা লক্ষ্যণীয় নয়। ফলে দোকানিরা ক্রেতাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতাচ্ছে র্নিভয়ে। এই অসাধু দোকানিদের বাণিজ্য বন্ধ করতে বা তাদের লাগাম টানতে সরকারসংশ্লিষ্টদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নতুবা আসছে ঈদুল ফিতরকে ঘিরে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে, ক্রেতা ঠকিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার লক্ষে।
এই বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাষ্য হচ্ছে, বাজার মনিটরিং কার্যক্রম চলমান আছে। আসছে রমজান ও ঈদ উপলক্ষে তা আরও জোরালো করা হবে। যদি কোনো দোকানি পণ্যের বিপরিতে অতিরিক্ত মূল্য হাতিয়ে নেয়, তা তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তরুণীর পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল…
সতর্কতামূলক পোস্ট
গত ২৭/২/২০২৩ তারিখে আমি এবং আমার আম্মু যাই বরিশালের গীর্জা মহল্লায় অবস্থিত ‘জাহান স্টাইল’ নামক দোকানে, আব্বুর জন্য একটা শার্ট কেনার জন্য। সেখানে গিয়ে আমরা বিভিন্ন শার্ট দেখতে থাকি। কয়েকটা শার্ট পছন্দ করি তখন সেখানকার সব থেকে সিনিয়র সেলসম্যান অন্য কয়েকটা শার্ট দেখিয়ে বলে, এই শার্টগুলো নতুন আসছে খুব ভালো কোয়ালিটি। দাম জানতে চাওয়ায় সে বলে, এখনো মূল্য বসানো হয়নি। কোড দেখে বলতে হবে।
তারপর কোড দেখে সে জানায় ২০৫০ টাকা।
মাথার ৫০ টাকা কম রাখতে বলায় তারা বলে, একদরের দোকান, কম হবে না। কিনে বের হয়ে খেয়াল করি ক্যাশমেমো দেয়নি। আবার গিয়ে ক্যাশমেমো চেয়ে আনতে হয়েছে। বেশ ভালো!!
তার ২ দিন পর আব্বু আরও একটা শার্ট কেনার জন্য সেই দোকানে গিয়ে দেখে সেইম শার্ট ১৪৯০ টাকা লাগানো। ওই দাম দেখে আব্বু জিজ্ঞেস করায় তারা তাকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে দেয়। তারা বলে, যারা শার্ট কিনেছে, তাদের পাঠাতে। তখন আব্বু ওই শার্টের একটা লেভেল খুলে নিয়ে আসে। সেদিন সন্ধ্যায় আমি আর আম্মু আবার যাই ক্যাশমেমো আর লেভেল নিয়ে। তখন তারা উল্টো আমাদের কে বলে মন-মানসিকতা ঠিক করতে। আমি তখন বলি, ‘এখন কি আমরা উদার হয়ে আপনাদের ৫৬০ টাকা দিয়ে দিবো? ওতো উদার আমরা না’। আমি বুঝলাম না, এতে আমাদের মন-মানসিকতা ঠিক করার কথা আসে কোথেকে!!
মোটকথা, তারা কোন মতেই তাদের অন্যায় স্বীকার করতে নারাজ। বিন্দুমাত্র অপরাধ বোধ ছিলো না তাদের। আবার বলতেছে, আমরা যদি টাকা না দেই, কি করবেন? তখন আমরা ভোক্তা অধিদপ্তরে কল দেওয়ার কথা বললে টাকা ব্যাক করে। এই হচ্ছে, বরিশালের মার্কেটের অবস্থা, যেখানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসার নামে লোক ঠকানো ব্যবসা করে বেড়াচ্ছে!!’
