
আজ শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ দেওয়া উদ্বোধনী ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপুল জনম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশে একটি নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করা হচ্ছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই এ নিশ্চয়তা দেবে।
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে। ‘হেলথ কার্ড’ সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে। আর ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকরা এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা পাবেন।
এ সময় স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে জানান তিনি। এসব কর্মী তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা ও উপযুক্ত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, ভাষাগত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গ্রহণ করা হচ্ছে। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে ‘ব্রেইন ড্রেন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।
কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজার সংযোগ সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদেরও সহায়তা দেওয়া হবে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলেও জানান সরকারপ্রধান।
পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই এখন বাংলাদেশে। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য কমানো, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।
এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও হতে হবে মিয়ানমারেই।
তারেক রহমান বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে আসছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে আরও গভীর দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে বাংলাদেশ।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সমান সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।