নিজস্ব প্রতিবেদক।।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাঁশ চাষের আবাদ বাড়লেও কমেছে বাঁশের ব্যবহার ও বিক্রি বসতবাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে ও পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে বাঁশ রোপণ করছেন স্থানীয়রা। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বাঁশ বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।
শিবচর উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে তিনটি ইউনিয়নে চরজানাজাত, বন্দর খোলা, মাদবরের চর বাশের আবাদ কম। প্রাচীন যুগ থেকে কৃষি কাজে পানের বরজ, সবজী বাগান, বাশের সাকো, গৃহ নির্মান, গেয়াল ঘড়, পাকের ঘড় ও বড় ঘড় বিভিন্ন হাট বাজারে দোকান ঘর নির্মানে বাশের ব্যবহার করতো।
প্লাস্টিক সিলভার তৈরি পণ্যের কারণে বাঁশের তৈরি ওরা, ঝাকা, কুলা, ঢালা, চালব, পলোসহ সব পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়ায় ওজাবাশ ও বরা বাঁশ বিক্রি অনেক কমে গিয়েছে।
এছাড়া বাশের কাজ করা শ্রমিক (ঘরামি) না পাওয়ায় এখন ইট, বালু, সিমেন্ট ও কাঠের ব্যবহার বেরেছে বিধায় বাঁশ আগের মতো ব্যবহার নাই, ফলে বিক্রি অনেক কম, কৃষি কাজে তেমন লাভ না হওয়ার অধিকাংশ কৃষক এখন অটোচালক, গার্মেন শ্রমিক, রাজমিস্ত্রীর পেশাসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকায় অনেক কৃষি জমি পরিত্যক্ত রয়েছে।
এই সব জমিতে বাঁশ বাগান করা হচ্ছে বিধায় বাশেঁর আবাদ বেড়েছে। বাঁশ চাষে খরচ নেই বলে যেকোনো স্থানে রোপন করা যায় এবং রোপন করা ঝাড়ে থেকে দুই-তিন বছরের মধ্যে আয় করা সম্ভব। ফলে অল্প খরচে আবাদের দিকে বেশী ঝুঁকছে। এতে খরচবিহীন চাষ এবং নিজের জায়গা নিজ দখলে রাখার বিষয় গুরুত্ব ছিলো।
শিবচর উপজেলার বাশকান্দি, খানকান্দি, উমেদপুর, ভান্ডারীকান্দি, ভদ্রাসন এর বিখ্যাত বাঁশ পানের বরজে ব্যবহারের জন্য বরিশালে যেতো এবং ঢাকার মগবাজার ও টুঙ্গিতে বড় আরতের মাধ্যমে বিক্রি করতো।
বাশেঁর চালি করে নদী পথে বরিশাল, পাঠাতো এবং টলার ও ট্রাকে ঢাকায় পাঠানো হতো। এখন পানের বরজ আগের চেয়ে কমে গিয়েছে। ঢাকায়ও স্থায়ী পাকাভবন নির্মাণরে কারণে বাশেঁর ব্যাবহার খুবই কম। তবে একজন মৃত্যু ব্যাক্তিকে দাফন করে বাঁশ ব্যবহার আগের মতই রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় গ্রামীণ নির্মাণ, ঘরের বেড়া, মাচা তৈরি, এমনকি নৌকা ও বিভিন্ন গৃহস্থালির কাজে বাঁশের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন বাঁশের জায়গা দখল করেছে লোহা, প্লাস্টিক ও কংক্রিটের বিভিন্ন উপকরণ। ফলে আগের মতো বাঁশের চাহিদা আর নেই।
শিবচরের একাধিক চাষি জানান, কয়েক বছর আগেও একটি বাঁশ ভালো দামে বিক্রি হলেও বর্তমানে সেই দাম অর্ধেকেরও কমে গেছে। অনেক সময় পরিবহন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচ উঠছে না, উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্মাণ খাতে বাঁশের ব্যবহার কমে যাওয়াই বাজারে এর প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া বড় বড় প্রকল্পে এখন আর বাঁশ ব্যবহার করা হয় না বললেই চলে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাঁশের বিকল্প ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা গেলে এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাঁশ দিয়ে আসবাবপত্র, হস্তশিল্প ও পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরিতে উদ্যোগ বাড়ালে চাষিরা আবারও আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।
এদিকে, লোকসানের কারণে নতুন করে বাঁশ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক কৃষক। কেউ কেউ ইতোমধ্যে বাঁশঝাড় কেটে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনা না হলে ভবিষ্যতে শিবচরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ চাষ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।