এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি // দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলবর্তী জনপদ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় অতি দরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি, কৃষিজমি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশন, মিষ্টি পানি সংরক্ষণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বদলে যেতে শুরু করেছে গ্রামীণ জনপদের চিত্র। একই সঙ্গে শত শত অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় প্রকল্পটি এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে।
প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় দুটি ইউনিয়নের ১০ থেকে ১২টি গ্রামের প্রায় ৮ হাজার পরিবারের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হচ্ছে। বছরের পর বছর বৃষ্টির পানি জমে থাকা হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি থেকে এখন দ্রুত পানি নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে কৃষকরা এক ফসলের পরিবর্তে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছেন।
প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখননের পাশাপাশি খালের দুই পাশে চলাচলের জন্য মাটির রাস্তা নির্মাণ, সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে ৫ হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ, মিষ্টি পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা, খাবার পানির সংকট নিরসনের উদ্যোগ, ছোট ছোট কাঠের সেতু নির্মাণ এবং কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের জন্য পাইপলাইন স্থাপনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি খাল খনন প্রকল্প নয়, বরং পরিবেশ, কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের একটি সমন্বিত উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিদপ্তরের উদ্যোগে অতি দরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচির অধীনে উপজেলার বলইবুনিয়া ইউনিয়নের বলইবুনিয়া মোল্লারজোর থেকে আমবাড়িয়া গাজীবাড়ি পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এবং খাউলিয়া ইউনিয়নের সন্ন্যাসী স্লুইসগেট এলাকা থেকে সাবেক চেয়ারম্যান আবুল খায়েরের খেজুরবাড়ি পর্যন্ত আরও ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ চলছে।
প্রতিটি প্রকল্পে ২৩৮ জন করে মোট ৪৭৬ জন অতিদরিদ্র শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। এতে একদিকে যেমন তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থারও উন্নতি ঘটছে। প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরি পেয়ে শ্রমিকরা সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে পারছেন।
এই প্রকল্পের সুফল ভোগ করবেন বলইবুনিয়া ইউনিয়নের আমবাড়িয়া, বাঁশবাড়িয়া ও পাতাবাড়িয়া এবং খাউলিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বরিশাল, মধ্য বরিশাল, মানিকজোর, খেজুরবাড়িয়া, উত্তর খেজুরবাড়িয়া, মধ্যম খেজুরবাড়িয়া, সন্ন্যাসীসহ আশপাশের গ্রামের হাজারো মানুষ। জলাবদ্ধতা দূর হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যচাষ ও গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটবে বলে আশা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এলাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত এ দুটি খাল বছরের পর বছর পলি জমে প্রায় ভরাট হয়ে যায়। পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে ফসলি মাঠে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকত। এতে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো এবং বহু জমি অনাবাদি হয়ে পড়ত। খাল পুনঃখননের ফলে আবারও স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরতে শুরু করেছে। কৃষকরা আশা করছেন, এখন থেকে সময়মতো জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে এবং উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
খাল খনন কাজে নিয়োজিত শ্রমিক পান্না মিয়া, মিজান শেখ, রফিকুল ইসলাম, রেনু বেগম, বিউটি বেগম ও ফুলমিয়াসহ অন্যরা জানান, নিজেদের গ্রামের উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিতে পেরে তারা গর্বিত। প্রতিদিনের মজুরিতে সংসার চালাতে সুবিধা হচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, এই খাল পুনঃখননের ফলে শুধু জলাবদ্ধতা দূর হবে না, বরং এলাকার কৃষি ও মানুষের জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
স্থানীয় কৃষকরাও সরকারের এ সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বহু বছর ধরে যে সমস্যার কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছিল, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার কার্যকর সমাধান হতে যাচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
খাউলিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও খাল খনন কমিটির সদস্য সচিব বিটুল বিশ্বাস বলেন, “খাল পুনঃখননের ফলে ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবার জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আহসান উল্লাহ বলেন, “অতি দরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় উপজেলার দুটি ইউনিয়নে মোট ৮ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ চলছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন, মিষ্টি পানি সংরক্ষণ, খাবার পানির সংকট দূরীকরণসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হবে। একই সঙ্গে অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হওয়ায় তাদের জীবনমানেরও উন্নতি ঘটবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে এ অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, টেকসই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ উন্নয়নে এটি একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ ধরনের খাল পুনঃখনন ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প সুন্দরবন উপকূলবর্তী অন্যান্য এলাকায়ও সম্প্রসারণ করা হলে জলাবদ্ধতা কমবে, কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।