মোঃ ছায়েদ হোসেন, রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি // ‘সুখবর, সুখবর, সুখবর। রামগঞ্জবাসীর জন্য সুখবর। মাথাব্যথা, কোমর ব্যথা, কাশি, হার্ট ও যৌন বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার সাহেব প্রতি সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার নিয়মিত রোগী দেখবেন....।’ রামগঞ্জ পৌর এলাকার সর্বত্র এখন বিপজ্জনক শব্দদূষণের এলাকায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন মাইকে নানামুখী প্রচারের শব্দে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শব্দ দূষণের কারণে মানুষের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত শব্দ উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথা ধরা, বদহজম, পেপটিক আলসার এবং অনিদ্রার কারণ বলে জানান চিকিৎসকরা। প্রতিকারের জন্য আইন থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। নীরব ঘাতক ভয়ানক ক্ষতিকর শব্দ দুষন থেকে মানুষকে রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবী সচেতন নাগরিকের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে ভর্তি, বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়গনিস্টিক সেন্টার, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, কোন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ ছাড়, মোবাইলের সীমাকার্ড মেলাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচারের ক্ষেত্রে উচ্চ শব্দে মাইকিং করা হয়। পৌর শহরে প্রতিদিন সকাল থেকে অধিক রাত পর্যন্ত ডিজেল ও পেট্রোলচালিত ইঞ্জিন বাস, ট্রাক, লরি, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, টেম্পু,অটো রিক্সা, অটো গাড়ী, টমটম মাহেন্দ্র ও থ্রিহুইলারের হাইড্রোলিক হর্ণ ও ডিজেল চালিত জেনারেটরের মাধ্যমে শব্দ দূষণ হয়। এছাড়াও রোগিদের আকৃষ্ট করতে চিকিৎসকের নামে প্রচার, ওয়াজ মাহফিলের প্রচার মাইকে বিভিন্ন ধরণের প্রচার চালানো হয়। এতে পৌর শহরে শব্দ দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাইড্রোলিক হর্ণ ও মাইকের শব্দ মানুষের কানের জন্য যন্ত্রণাদায়ক।এছাড়াও কমদামে এলইডি বাল্ব বেচার প্রচারে উচ্চ শব্দে মাইকিং চলছে নিয়মিত। এই ধরনের মাইকিং রামগঞ্জ শহরের নিত্য যন্ত্রণা। বিষয়টি এখন চলে গেছে শহরবাসীর কাছে অসহনীয় পর্যায়ে। এতে কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে কানে আঙ্গুল দিয়ে পথ চলেন। এছাড়াও রয়েছে যেখানে সেখানে রাস্তার ওপর হোন্ডা গ্যারেজ, কাঠ ও স্টিলের আসবাব পত্র তৈরীতে ব্যবহৃত যন্ত্রের বিকট শব্দ। এর ওপর রয়েছে যত্রতত্র গান লোডের দোকানের সাউন্ড বক্সের শব্দ। আর ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সা গাড়ির হর্ণ তো রয়েছেই। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যেসব স্থানে মাইক বন্ধ রাখার নিয়ম রয়েছে, তাও মানছেনা কেউ।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ উল্লেখ আছে, সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। একইভাবে নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল,মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়। এর ওপরে শব্দ সৃষ্টি করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বিধিমালায় আরও উল্লেখ আছে, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই সকল জায়গায় মোটর গাড়ির হর্ণ বাজানো বা মাইকিং করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। এ সকল নিয়ম নীতি ও আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিন রামগঞ্জ পৌর শহরে মাইকে প্রচার ও বিভিন্ন গাড়ীর হাউড্রোলিক হর্ণ অহরহ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রিকশা, ইজিবাইক ও অটোরিকশায় মাইক ব্যবহার করে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে চিকিৎসক, কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টারগুলোতে ভর্তি বিজ্ঞপ্তিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচার চলছে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। ফলে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়গুলোতে দৈনন্দিন কাজ সারতে সমস্যায় পড়ছেন সংশ্লিষ্ট লোকজন। দিনের বেলা ছাড়াও সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব যন্ত্র ব্যবহৃত হয়। ফলে রাস্তার পাশে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হাসপাতাল, অফিস, ব্যাংক-বিমার দাপ্তরিক কাজে ব্যাঘাত হচ্ছে।
রামগঞ্জ পৌর মেয়র বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের শব্দ দূষণে পৌরবাসী অতিষ্ঠের কথা স্বীকার করে বলেন, পৌর বাসীকে শব্দ দুষনের হাত থেকে রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি কিন্তু রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, শব্দ দুষন রোধে সচেতন নাগরিক ও সংশ্লিষ্টদের ডেকে সভা করা হবে। তারপরও শব্দ দুষণ রোধ করা সম্ভব না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেব।
রামগঞ্জ উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকতা ডাঃ গুনময় পোদ্দায় বলেন, শব্দ দূষণের কারণে শ্রবন শক্তি ও মেমোরি কমে যায়। কানের টিস্যুগুলো আস্তে আস্তে বিকল হয়ে পড়ে তখন সে স্বাভাবিক শব্দ শুনতে পায় না। শিশুদের মধ্যে মানসিক ভীতির সৃষ্টি হয়। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষের কারোনারি হার্ট ডিজিজ ,কণ্ঠনালির প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ, নিন্দ্রাহীনতা, আলসার ও মস্তিকের রোগ হতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবীবা মীরা বলেন, এ ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।