বিশেষ প্রতিবেদন।।
ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবের কারণে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিভাগীয় শহর বরিশাল পুরোপুরি বাসযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তীব্র লবণাক্ততার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী শস্যভাণ্ডার এখন অস্তিত্ব সংকটে।
মূল ঝুঁকির কারণসমূহ: কেন হুমকির মুখে বরিশাল?
বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC)-এর তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চল হিসেবে বরিশাল বেশ কিছু মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে:
* **সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (Sea Level Rise):** বরিশাল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ১ মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে দেশের ১৭.৫% অংশ সরাসরি তলিয়ে যাবে, যার মধ্যে বরিশাল অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তীব্র জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস: কীর্তনখোলা নদী বেষ্টিত বরিশাল শহর এখনই বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে সাইক্লোন ও মৌসুমী বন্যার তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি দিন দিন বাড়ছে।
* **কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ধস:** অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে প্রবেশ করায় বরিশালের ঐতিহ্যবাহী আমন ও আউশ ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গবেষকদের মতে, ২০৮০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ২১% থেকে ৯% এ নেমে আসতে পারে।
ভূগর্ভস্থ পানির সংকট: একদিকে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে সুপেয় পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে নগর ও গ্রামীণ এলাকায় তীব্র খাবার পানির সংকট তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি: দুর্ভোগে জনজীবন
স্থানীয় আবহাওয়া তথ্যানুযায়ী, বরিশালে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রতি বছর প্রায় ০.০০৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমছে। এর ফলে—
১. বর্ষা মৌসুমে শহরের বস্তি ও নিচু এলাকাগুলো মাসের পর মাস জলমগ্ন (Waterlogging) থাকছে।
২. জলবাহিত রোগের প্রকোপ গত এক দশকে প্রায় ৯৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩. নদীভাঙন ও জীবিকা হারিয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বরিশাল ছেড়ে রাজধানীমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ (Climate Displacement)।
> **বিশেষজ্ঞদের অভিমত:**
> "জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা যদি রোধ করা না যায় এবং এখনই যদি দীর্ঘমেয়াদী টেকসই বাঁধ বা জলবায়ু অভিযোজন (Adaptation) প্রকল্প গ্রহণ করা না হয়, তবে আগামী এক শতাব্দীর মধ্যে বরিশালের এক বিশাল অংশ মানব বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।"
>
বাঁচানোর উপায় কী?
সম্পূর্ণরূপে বাসযোগ্যতা হারানোর এই পূর্বাভাস রুখতে এখনই কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস: বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা।
অভিযোজন কৌশল: বরিশালের কৃষকদের উদ্ভাবিত ২০০ বছরের পুরোনো 'ভাসমান চাষাবাদ' (Floating Agriculture) এবং 'সরজান পদ্ধতি' (উঁচু ভিটি ও পরিখা খনন করে চাষ) ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দেওয়া।
টেকসই অবকাঠামো:নদী ভাঙন রোধে শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা।
প্রকৃতির এই সতর্কবার্তাকে অবহেলা করলে, আগামী প্রজন্মের কাছে বরিশাল কেবলই এক হারিয়ে যাওয়া জনপদের ইতিহাস হয়ে থাকবে।
সম্পাদক : মো: রাকিবুল হাছান(ফয়সাল)।