
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণিকরণের নীতিমালা কঠোর করার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত মেনে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১২ সালের ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা পুনর্বহাল করেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখানোর নীতি থেকে সরে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের লুকানো খেলাপি ঋণ বের হয়ে আসছে।
খেলাপি ঋণের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরের দিন থেকেই ওই ঋণকে খেলাপি বা বকেয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর মানে হলো, এখন থেকে কোনো ঋণগ্রহীতা তিন মাস কিস্তি পরিশোধ না করলেই তিনি খেলাপি হিসেবে গণ্য হবেন। আগে কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯ মাস পর কোনো ঋণকে খেলাপি করা হতো। নীতিমালার এ পরিবর্তনের ফলে খেলাপি ঋণের হিসাবে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। এর মধ্যেই খেলাপি ঋণের (এনপিএল) লাগামহীন বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সেই সঙ্গে এটি কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জোর তাগিদ দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি দেশের ৪৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেখানে প্রতিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় পরিস্থিতি, পুনঃতফসিল ও অবলোপন পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়। মূলত ব্যাংক ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতার স্বার্থে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি কমিয়ে আনতে চাইছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে- গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বা ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। ফলে ছয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে ১ লাখ ৮৮ হাজার ১১ কোটি এবং জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, নতুন নীতিমালা কার্যকরের প্রথম তিন মাসে অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছিল খেলাপি ঋণ। তবে শেষ তিন মাসে সেই গতি কমে এসেছে। আগামী ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ না বেড়ে উল্টো কমবেÑ এমনটাই আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক প্রান্তিকে লুকানো খেলাপি ঋণ বের হয়ে আসায় ব্যাংক খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর প্রেক্ষিতে এখন ছাড় দিয়ে হলেও তা কমানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়ে সার্কুলার জারি করে। এতে গত জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণে পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়। গত মঙ্গলবার সেই সার্কুলারে আরও শিথিলতা আনা হয়েছে। নতুন সার্কুলারে বলা হয়েছেÑ আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত খেলাপি হওয়া ঋণে এ সুবিধা দেওয়া হবে।
এর আগে, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পুনর্গঠনে নীতি সহায়তা কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই কমিটির আওতায় চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান পুনঃতফসিল সুবিধা পায়। অন্যদিকে সম্প্রতি খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ অবলোপনের শর্ত দুই দফা শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে যেসব ঋণ টানা দুই বছর মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত থাকে, শুধু সেসব ঋণই অবলোপন করা যেত। সেটি শিথিল করে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ৩০ দিনের নোটিশ দিয়ে অবলোপনের সুযোগ দেওয়া হয়। আর গত সপ্তাহে সেটি আরও শিথিল করে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ১০ কর্মদিবস আগে নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে অবলোপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।