Home » অন্যান্য » কফি হাউজের আড্ডা আছে, মান্না দে নেই

কফি হাউজের আড্ডা আছে, মান্না দে নেই

বাংলার কন্ঠস্বর প্রতিবেদক : কলকাতার কলেজ রোডে কফি হাউজের আড্ডাটা এখনও জমজমাট। শুধু সেখানে নেই নিখিলেশ, মইদুল, সুজাতারা। তাদের না থাকার এ কাহিনী আমাদের জানিয়েছিলেন শিল্পী মান্না দে। তার গাওয়া ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটি যেন অনেকেরই হৃদয়ের হাহাকার যন্ত্রণাকে প্রকাশ করেছে।

এখনও কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে অনেকেই আনমনে গাইতে থাকেন- ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই।’ এ গান গেয়েই আড্ডায় ঝড় তোলেন অনেকে। কলকাতার কফি হাউজ থেকে ঢাকার টিএসসি, সব জায়গায় সমানতালে জনপ্রিয় মান্না দে’র গাওয়া এ গানটি।

আড্ডা কিংবা একাকিত্বের সময় মান্না দে’র গাওয়া গান এখনও প্রাণসঞ্চার করে। কিংবদন্তি এ সঙ্গীতশিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন দুই বছর হলো। মায়ার খেলা সাঙ্গ করে ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর ব্যাঙ্গালুরুর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মান্না দে।

তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তার গাওয়া আবার হবে তো দেখা, এই কূলে আমি/আর ওই কূলে তুমি, তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়, যদি কাগজে লেখো নাম, সে আমার ছোট বোনসহ অসংখ্য কালজয়ী গান এখনও আমাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে মিশে হয়ে গেছে যাপিত জীবনের অংশ হয়ে।

গুণী এ সঙ্গীতশিল্পীর জন্ম ১৯১৯ সালের ১ মে কলকাতায়। তার আসল নাম প্রবোধ চন্দ্র দে হলেও দীর্ঘ ষাট বছরের সংগীতময় জীবনে ‘মান্না দে’ নামেই খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রে দারুণ জনপ্রিয়তা পান তিনি। সংগীত জীবনে তিনি সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেন।

মান্না দে’র পড়ালেখা শুরু হয় ‘ইন্দু বাবুর পাঠশালা’ নামের একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুল এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে এবং ওস্তাদ দবির খানের কাছ থেকে গানের হাতেখড়ি হয় মান্না দে’র।

১৯৪২ সালে কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দের সঙ্গে মুম্বাই যান তিনি। সেখানে শুরুতে কৃষ্ণ চন্দ্র দের অধীনে সহকারী হিসেবে এবং তারপর শচীন দেব বর্মণের (এসডি বর্মণ) অধীনে কাজ করেন। পরে তিনি অনেক স্বনামধন্য গীতিকারের সান্নিধ্যে আসেন এবং তারপর স্বাধীনভাবে নিজেই কাজ করতে শুরু করেন। এ সময় বিভিন্ন হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি ওস্তাদ আমান আলী খান এবং ওস্তাদ আবদুল রহমান খানের কাছ থেকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে তামিল নেন মান্না দে।

১৯৫৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর দক্ষিণাঞ্চলের কেরালার মেয়ে সুলোচনা কুমারনকে বিয়ে করেন মান্না দে। তাদের সংসারে শুরোমা (১৯৫৬) ও সুমিতা (১৯৫৮) নামে দুই কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। ২০১২ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সুলোচনা। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুম্বাইয়ে কাটানোর পর মৃত্যুর আগে কয়েক বছর ধরে বেঙ্গালুরুর কালিয়ানগর শহরে বসবাস করছিলেন মান্না দে।

২০০৫ সালে বাংলা ভাষায় তার আত্মজীবনী ‘জীবনের জলসা ঘরে’ আনন্দ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। পরে এটি ইংরেজিতে ‘মেমরিজ কাম এলাইভ’, হিন্দিতে ‘ইয়াদেন জি ওথি’ এবং মারাঠী ভাষায় ‘জীবনের জলসা ঘরে’ নামে ভাষান্তর হয়।

মান্না দে’র জীবনী নিয়ে ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে একটি তথ্যচিত্র মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। মান্না দে সংগীত একাডেমি তার সম্পূর্ণ আর্কাইভ বিকশিত ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে। প্রখ্যাত রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় মান্না দে’র সংগীত সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় ষাট বছরের সংগীত জীবনে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’, ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং ‘দাদা সাহেব ফালকে’ খেতাবসহ অসংখ্য খেতাব অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়া ২০০৪ সালে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও ২০০৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ডি লিট সম্মাননা লাভ করেন।

মান্না দে’র গাওয়া জনপ্রিয় বাংলা গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- কফি হাউজের সেই আড্ডা, সবাই তো সুখী হতে চায়, যদি কাগজে লিখ নাম, পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা সেইদিন, কতদিন দেখিনি তোমায়, এ কূলে আমি, কথা দাও, খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমি সারারাত, এ নদী এমন নদী, মাঝরাতে ঘুম, এই আছি বেশ, এই রাত যদি, কি এমন কথা, ক’ফোঁটা চোখের জল, সে আমার ছোটবোন, দীপ ছিল শিখা ছিল, যদি হিমালয়-আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ, শাওন রাতে, আমার ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে, স্বপ্নে বাজেগো বাঁশি, তীর ভাঙা ঢেউ, না না যেও না, তুমি আর ডেকো না, সুন্দরী গো দোহাই দোহাই।

হিন্দি ভাষায় মান্না দে’র গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইয়ারি হে ইমান মেরা ইয়ার মেরি জিন্দেগি, না মাঙ্‌গু সোনা চান্দি, জিন্দেগি ক্যয়সি হে পাহেলি হায়, পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া, লাগা চুনরি মে দাগ, এ মেরি জোহরা জাবিন, চুনরি সামহাল গোরি, এক চতুর নার কারকে সিঙ্গার, ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোরেঙ্গে, মুড় মুড় কে না দেখ প্রভৃতি।

 

 

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 114 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*