Home » অন্যান্য » ভুল সময়ের প্রজনন মৌসুম : ৭০ ভাগ ইলিশের পেটেই ডিম

ভুল সময়ের প্রজনন মৌসুম : ৭০ ভাগ ইলিশের পেটেই ডিম

বাংলার কন্ঠস্বর প্রতিবেদকইলিশ ধরায় ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা অভিযান শেষে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে প্রচুর ইলিশ। তবে ধরা পড়া ইলিশের ৭০ ভাগের পেটেই ডিম রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। তাই অভিযানের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

জেলেরা বলছেন, পনের দিন পেছানো হলে আরও বেশী ইলিশ ডিম ছাড়তে পারত।

জলবায়ুর প্রভাবে ইলিশ ধরার মৌসুম এবার জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে পিছিয়ে আষাঢ়ের শেষ দিক থেকে শুরু হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী শেষ কার্তিক পর্যন্ত ইলিশের দেখা মিলবে বলে আশায় বুক বেঁধে আছেন জেলেরা। এ বছর বৈরী আবহাওয়া, ডাকাতের উপদ্রব আর ভরা মৌসুমেও ইলিশের তেমন দেখা মেলেনি বলে জেলেরা অপেক্ষায় ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে ১০ আশ্বিন থেকে ২৪ আশ্বিন এই দুই সপ্তাহ ইলিশের প্রজনন মৌসুম বলে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পর সোমবার বরিশালের পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ মাছের আমদানি বেড়েছে।

বাউফলের ধূলিয়া থেকে আসা জেলে মো. বাবুল মিয়ার বলেন, ‘এখানে যে সব মাছ ধরা পড়ছে তার প্রায় প্রতিটির পেটেই ডিম পাওয়া যাচ্ছে। আসলে, ডিম ছাড়ার উপযুক্ত সময়ের আগেই প্রজনন মৌসুম ঘোষণা করায় সব মাছ ডিম ছাড়তে পারেনি।’

মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে ইলিশ মাছ কাটার কাজ করা মো. লিটন হাওলাদার  বলেন, ‘আমি যত মাছ কেটেছি তার মধ্যে ৭০ ভাগের পেটেই ডিম পেয়েছি। ১৫ দিন পর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে এ সব ইলিশ ডিম ছাড়তে পারত।’

তবে দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার পর জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ায় বেজায় খুশী নলচর থেকে মাছ নিয়ে আসা জেলে মো. হেলাল উদ্দীন। তিনি জানান, অনেক দিন অপেক্ষার পর এখন মাছ পড়েছে। তার নিজের ডিঙ্গি নৌকা আছে। দাদন নিয়েছেন মহাজনের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এতদিন চিন্তায় ছিলেন তিনি। তবে এখন মাছ পড়ায় আশা করছেন সামনের অমাবশ্যায় ইলিশের আরও দেখা মিলবে।

জেলেরা খুশী হলেও আড়ৎদার ইয়ার হোসেন জানালেন, এখন অন্যান্য প্রজাতির মাছ বাজারে বেশ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ইলিশের দেখা মেলায় বাজার দর পড়ে তারা লোকসান গুনছেন।

জেলেরা জানান, ১০ অক্টোবর এই মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে ৮০০ মণ ইলিশ এসেছে। সেদিন ছোট সাইজের ইলিশের দাম ছিল মণপ্রতি সাড়ে ৮ হাজার টাকা, ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামের ইলিশ ১৪ হাজার টাকা, ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২০ হাজার টাকা, ৬০০ থেকে ৯০০ গ্রাম রফতানিযোগ্য ইলিশ ২৮ হাজার টাকা, ১ কেজি ওজনের ইলিশ ৩৭ হাজার টাকা এবং তার উপরের ইলিশ ছিল ৪২ হাজার টাকা। পরদিন ১১ অক্টোবর মাছ আরও আসায় কেজিপ্রতি ১ থেকে ৩ হাজার টাকা দাম কমেছে।

জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে আনা পাইকারদেরও লোকসান গুনতে হয়েছে। ফলে সোমবার বরিশালে এই মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে কম মাছ উঠেছে। মাছের যোগান কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে কিছুটা।

জেলা মৎস্য আড়ৎদার এসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত কান্তি দাশ  অভিযোগ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে ইলিশের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাংলাদেশী জেলারা সে সময় মাছ না ধরায় ভারতীয় জেলাদের জালে এবার মাছ বেশী ধরা পড়েছে। কারণ, বাংলাদেশীরা মাছ না ধরার কারণে ওই মাছগুলোর একটি অংশ চালনার খাড়ি দিয়ে ভারতের সমুদ্র সীমানায় চলে গেছে।’

অজিত কান্তি দাশ আরও বলেন, ‘আমার সাথে পশ্চিমবঙ্গের ইলিশ এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি অতুল দাশের সাথে কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাদের ওখানে এখন ইলিশ রাখার জায়গা নেই। বরিশালে ছোট সাইজের ইলিশ কেজিপ্রতি ১৮৬ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে— পশ্চিমবঙ্গে তা এক শ’ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে বলেও অতুল দাশ আমাকে জানিয়েছেন। এ জন্য ইলিশ প্রজননের মৌসুমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় আশ্বিনের শেষ দিক থেকে করলে ভাল হতো।’

এদিকে নিষেধাজ্ঞার জন্য বরফ কলগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখায় ৯ অক্টোবর অভিযান শেষ হলেও তিন দিন পর বরফ নিয়ে জেলেরা ট্রলার নিয়ে সাগরে গেছেন। এতে করে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে।

প্রজনন মৌসুমের সময় পেছানো নিয়ে জেলে এবং মাছ ব্যবসায়ীদের অভিমতের বিষয়ে ইলিশ গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। ইলিশ মাছ সাধারণত সারা বছরই ডিম ছাড়ে। তবে আশ্বিন মাসের ভরা পূর্ণিমায় ডিম ছাড়ার প্রধান মৌসুম বলে তারা এই সময়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এবারও এখন পর্যন্ত পরীক্ষা করে যা পেয়েছি তাতে ৩৫ থেকে ৩৭ ভাগ ইলিশ ডিম ছেড়েছে। এটা ৪০ ভাগ হলে ভাল হয়। কেবল ২০১৩ সালে ৪১ ভাগ মাছ ডিম ছেড়েছিল বলে তারা পরীক্ষা করে পেয়েছিলেন। তবে ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য আরেকটি উপযুক্ত সময় সামনে অমবশ্যায় রয়েছে বলে তারা অপেক্ষায় আছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘জেলেরা প্রজনন মৌসুমের সময় পিছিয়ে দেওয়ার যে সব যুক্তি তুলছেন এ নিয়ে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন। গবেষণার ফল অনুযায়ী প্রয়োজনে প্রজনন মৌসুমের সময় পেছানো হবে।’

সম্পাদনাঃ গাজী মামুন আহম্মেদ (বাংলার কন্ঠস্বর )

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 54 - Today Page Visits: 3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*