Home » তথ্য-প্রযুক্তি » ‘ফেসবুক বন্ধে ভোগান্তি শুধু জনগণের’

‘ফেসবুক বন্ধে ভোগান্তি শুধু জনগণের’

ডেস্ক রিপোর্ট : নাশকতা ঠেকাতে এবং জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে ফেসবুক বন্ধ করে রাখা হয়েছে বলা হলেও দেশে ফেসবুকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অনেকেই বিকল্প প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারছেন। যদিও দেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ফেসবুক ব্যবহারে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি সরকার, তারপরেও কেউ কেউ ফেসবুক বন্ধে সরকারি নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ রেখেছেন।
অনেকে আবার চেষ্টা করেও ফেসবুকে ঢুকতে পারছেন না। তবে ফেসবুক বন্ধ করার কারণে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাক বা না যাক, তাদের ভোগান্তি যে বেড়েছে সে কথ বলছেন প্রায় সবাই।
এমনই একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদকন্যা শাওন মাহমুদ। ফোনে ভিপিএন প্রযুক্তিতে ফেসবুক ব্যবহার করছেন তিনি।
বিকল্প পথে ফেসবুকে সক্রিয় থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফেসবুক ব্যবহার এখন একটি অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া আমি অনলাইনে প্রচুর খবর পড়ি। ফেসবুক থেকেই আমি বেশিরভাগ সংবাদের লিংক পাই। এটি ফেসবুক ব্যবহারের প্রধান একটি কারণ।’
নাশকতা ঠেকাতে ফেসবুক বন্ধ করার যৌক্তিকতা নিয়ে শাওন বলেন, ‘ফেসবুক বন্ধ করে যদি নাশকতা ঠেকানো যেতো তবে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ বহু আগেই আইএসকে থামাতে ফেসবুক বন্ধ করে দিতেন। প্রযুক্তি আটকে দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব হলে গুগলও অনেক আগেই ইউটিউব বন্ধ করে দিতো। কারণ আইএসসহ জঙ্গি সংগঠনগুলো ইউটিউবে প্রচুর ভিডিওবার্তা প্রকাশ করে। আর সেখানে ফেসবুক ব্যবহারতো পুরোপুরি বন্ধও করা যাচ্ছে না।’
শাওন মাহমুদ হতাশার সঙ্গে বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ গৃহিণী হয়েও যদি এতো সহজে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারি, তবে যারা তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখে তাদের কাছে তো ফেসবুক চালানো কোনো বিষয়ই না। এটা আসলে একটা লোক দেখানো ব্যাপার।’
বাংলাদেশে ফেসবুকের আপাত সঙ্কটকালে আরো একজন ফেসবুকার হলেন সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও ব্লগার আরিফ জেবতিক। বিকল্প উপায়ে প্রক্সি সার্ভার দিয়ে তিনি ফেসবুক ব্যবহার করছেন।
ফেসবুক ব্যবহার করা ও সরকারের নির্দেশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার জনগণকে ফেসবুক ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে, এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। আমি যতদূর জানি, সরকার লোকাল ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইএসপি) বলেছে ফেসবুক ব্লক করে রাখতে। লোকাল আইএসপিগুলো যদি ফেসবুক বন্ধ না করে তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কিন্তু জনগণের ফেসবুক ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত কারো ফেসবুক ব্যবহারের ওপর অ্যাকশন নেওয়া যাবে না।’
শুধু ফেসবুক ব্যবহারের কারণে যদি কোনো শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়ে থাকলে তা বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি আইনে নেই বলে জানান আরিফ জেবতিক।
ফেসবুকের জন্য কাউকে দ- দেওয়া হলে সে নিশ্চয়ই নিজেকে রক্ষায় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার ওপরও এমন কিছু আসলে আমিও এর বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেবো।’
নিরাপত্তার স্বার্থে ফেসবুক বন্ধ করার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আরিফ বলেন, সরকারের চেষ্টায় আমি খুশি। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে আসলে এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের কতোটা ট্র্যাক করা সম্ভব সেটাই আসলে প্রশ্ন। কারণ তারা তো সবসময়ই বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি মনে করে তাদের প্রযুক্তি দিয়ে ফেসবুক বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, তবে এতে আমার পুরো সমর্থন আছে। কেননা নিরাপত্তাই এখানে প্রধান বিষয়।’
শাওন বা জেবতিকের মতো অনেকে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারলেও অনেকেই ঢুকতে পারছেন না নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। এদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট আফসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ফেসবুকে ঢুকতে না পারায় তার সব ধরণের যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
‘আমার অধিকাংশ যোগাযোগই আন্তর্জাতিক। ফেসবুক বন্ধ থাকায় আমি তাদের সঙ্গে প্রয়োজনেও যোগাযোগ করতে পারছি না। আমার ছাত্রদের সবার সঙ্গে তো আর ফোনে যোগাযোগ হয় না। তারা ফেসবুকে আমার কাছ থেকে লেকচার নিতো, পড়ার ব্যাপারে পরামর্শ নিতো। এখন সেসবও বন্ধ।’
আফসান চৌধুরী দুঃখ করে বলেন, ‘আমি লেখক মানুষ। ফেসবুকের মাধ্যমে আমি আমার লেখাগুলোকে শেয়ার করি। সেগুলোর প্রচার করি। ফেসবুক ব্যবহার করতে না পারায় এখন আমি লেখা শেয়ার করতে পারছি না। মানুষকে জানাতে পারছি না। ফলে আমার লেখার উৎসাহই কমে যাচ্ছে।’
অনলাইন পত্রিকাগুলোও ফেসবুকে লেখা শেয়ার করতে পারছে না বলে তাদের পাঠকসংখ্যা অনেক কমে যাচ্ছে। এতে তারা লেখা প্রকাশে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে জানান তিনি। ফেসবুক তার কাছে সামাজিক মাধ্যমের চেয়ে বেশি প্রচার মাধ্যম। এটি বন্ধ হওয়ায় নিজের ওয়েবসাইট চালুর চিন্তাও পিছিয়ে দিয়েছেন বলে জানান আফসান চৌধুরী। কেননা ফেসবুক না থাকলে তিনি সবাইকে জানাবেন কী করে তিনি ওয়েবসাইট খুলেছেন?
নিরাপত্তার অজুহাতে ফেসবুক বন্ধ করাকে যুক্তিসঙ্গতও মনে করেন না আফসান চৌধুরী। তার পরিচিত অনেকেই ফেসবুক চালাতে পারছেন। ‘যারা ফেসবুক ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালায় তারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নয়। তারা জানে কীভাবে বিকল্প ব্যবস্থায় ফেসবুকে ঢুকতে হয়। সুতরাং এভাবে আটকানো যাচ্ছে শুধু আম ফেসবুক ব্যবহারকারীদের। তাই ভোগান্তি শুধু তাদেরই।’
একই বক্তব্য গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের। সরকারের নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেসবুক ব্যবহারে বিরত আছেন তিনি। তিনি মনে করেন এতে শুধু যে জনগণ বিরক্ত হচ্ছে তাই নয়, এতে তাদের মত প্রকাশের সাংবিধানিক স্বাধীনতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা বিকল্প উপায় ব্যবহার করেই এসব মাধ্যম ব্যবহার করে যেনো তাদের সহজে ট্রেস করা না যায়। তবে এভাবে ফেসবুক বন্ধ করে লাভ কী?
‘মাথাব্যথা হলে তো আর আপনি মাথা কেটে ফেলবেন না। তাহলে ফেসবুক ব্যবহার করে নাশকতা করার চেষ্টা করলে ফেসবুক কেনো বন্ধ করতে হবে? বরং সেই নাশকতার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। চেষ্টা করতে হবে যেনো নাশকতার কাজে তারা ফেসবুক ব্যবহার না করতে পারে। পুরো সিস্টেম বন্ধ করলে তো চলবে না।’
অন্যদিকে সরকার ফেসবুক বন্ধ করলেও সরকারি অনেক ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনই বিকল্প উপায়ে ফেসবুক ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন ইমরান। তিনি বলেন, সরকার নিয়ম তৈরি করে নিজেরাই যদি অমান্য করেন তাহলে জনগণেরই সমস্যা। এদিকটা সরকারের খেয়াল রাখা উচিত।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুককে ইমরানও প্রচারমাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, ‘ফেসবুককে আমি আমার আদর্শ, বক্তব্য প্রচারের কাজে, মানুষকে সংগঠিত করার কাজে ব্যবহার করি। এখন ফেসবুক না থাকায় এসবসহ আমার সব ধরনের যোগাযোগই ব্যাহত হচ্ছে।’
দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের সময়ে ফেসবুক বন্ধ করলেও এখনো তা কেনো খুলে দেওয়া হচ্ছে না সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইমরান এইচ সরকার। একটানা এভাবে ফেসবুক বন্ধ রাখায় সামগ্রিকভাবে জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন ফেসবুকের মাধ্যমে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র।
‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার অবশ্যই এমন পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে তা নিশ্চয়ই অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়।’ চ্যানেল আই অনলাইন

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 40 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*