বড় ঘরের মেয়ে

মূল : মুন্সী প্রেমচাঁদ, অনুবাদ : ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী

[মুন্সী প্রেমচাঁদ সম্পর্কে নতুন কিছু না লিখলেও চলে। তার সম্পর্কে অনেক আলোচনা বহুখানে পাওয়া যায়। একথা বিদিত যে, উর্দু ছোটগল্পের বয়স মাত্র ১১২ বছর (জন্ম-১৯০৩)। মাওলানা রাশিদুল খায়রী, প্রেমচাঁদ, সাজ্জাদ হায়দার ইয়ালদারাম প্রমুখের নাম উর্দু ছোটগল্পের প্রতিষ্ঠাতাদের তালিকায় আসে। প্রেমচাঁদ এখনও উর্দু ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠলেখক হিসাবে পরিচিত। তাকে এখনও ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি কেউ। তিনি প্রায় ২৫০টি ছোটগল্প লিখেছেন। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ হলো ‘সুযে ওয়াতান’—১৯০৮ সালে ৫টি গল্প নিয়ে প্রকাশ হয়েছিল। এ ছাড়াও প্রেম পচীসী, প্রেম বত্তীসী, খাকে পরওয়ানা, খাম ও খিয়াল, ফেরদাউসসে খেয়াল, প্রেম চালিসী, আখিরী তুহফা, যাদে রাহ, দুধ কি কীমত ও ওয়ারিদাত তার গল্পগ্রন্থ। প্রেমচাঁদ তার ছোটগল্পে এ দেশীয় সমাজ ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন তার গল্পের মাধ্যমে। ‘বড়ে ঘরকি বেটি’ গল্পের আনন্দী কিংবা ‘হজ্জে আকবর’-এর আব্বাসীর মহানত্ব সত্যিই আমাদের মুগ্ধ করে। প্রেম চাঁদের সেরা গল্পের মধ্যে রয়েছে ‘কাফন’, ‘পৌষ কি রাত’, ‘দুধ কি কীমত’, ‘দু বায়ল’, ‘নিমক কা দারোগা’, ‘তুলুয়ে মুহাব্বত’, ‘নাজাত’, ‘মিস পদ্মা’, ‘নায়ী বিবি’, ‘দুবহনে’, ইত্যাদি। প্রেমচাঁদ তার ছোটগল্পের বিষয়বস্তু, ভাষা ও সাহিত্যমানের কারণে উর্দু ছোটগল্পে এখনও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন।অনুবাদক ]

বেণী মাধব সিং গৌরীপুর মৌজার জমিদার ও রাজস্ব উত্তোলনকারী। তার পূর্ব পুরুষ কোনো এক সময় অনেক সম্পদশালী ছিল। পাকা পুকুরঘাট আর মন্দির তা-ই মনে করিয়ে দেয়। শোনা যায়, সেই ফটকে হাতি হেলে দুলে চলতো। বর্তমানে সেই হাতির প্রতিনিধিত্ব করছে একটি বৃদ্ধ মহিষ। যার শরীরে গোশত খুব একটা নেই। তবে দুধ মনে হয় অনেক আছে, কেননা সব সময় কেউ না কেউ পাত্র নিয়ে তার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে।

বেণী মাধব সিং অর্ধেকের বেশী সম্পদ উকিলের পিছনে খরচ করেছেন। বর্তমানে তার বার্ষিক আয় এক হাজারেরর বেশী নয়। তার দু’ছেলে । বড় ছেলের নাম শ্রীকণ্ঠ। সে দীর্ঘ সময়ের আপ্রাণ চেষ্টায় বি এ ডিগ্রি অর্জন করেছে। সে এক অফিসে চাকরি করে এখন। ছোট ছেলে লাল বাহাদুর সিং দোহারা গড়নের সুদর্শন যুবক। ভরাট মুখ, প্রশস্ত বুক; দুই সের মহিষের দুধে তার নাস্তা হয়। শ্রীকণ্ঠ তার বিপরীত বাহ্যিক সৌন্দর্যকে ইংরেজি দুটি অক্ষর B A— এর পিছনে কুরবান করে দিয়েছে। এ দু’অক্ষর তার বুকের প্রশস্ততা, শারীরিক উচ্চতা, চেহারার উজ্জ্বলতা সব হজম করে ফেলেছে। এ মহান ব্যক্তি এখন তার অবসর সময় কাটায় চিকিৎসা বিষয়ক পড়াশুনা করে। আয়ুবের্দিক ওষুধের প্রতি তার ভক্তি বেশী। সকাল-সন্ধ্যায় অধিকাংশ সময় তার কক্ষে হামান দস্তির ছন্দ তোলা আওয়াজ শোনা যায়। লাহোর আর কলকাতার আয়ুর্বেদিকদের সাথে পত্র যোগাযোগ চলতেই থাকে। শ্রীকণ্ঠ ইংরেজী ডিগ্রি অর্জন সত্ত্বেও ইংরেজদের সামাজিকতার সমর্থক নয়। বরং এর বিপরীতে অধিকাংশ সময় দৃঢ়তার সাথে ইংরেজদের সমালোচনা করে। এ জন্য গ্রামের লোকেরা তাকে সম্মানের চোখে দেখে। দশমীর দিনে খুব আবেগের সাথে রাম লীলায় অংশ নেয়। তখন নিজেই কোনো চরিত্রে সঙ সাজে। তার কারণেই গৌরীপুরে রামলীলার প্রবর্তন হয়েছে। প্রাচীন প্রথা ধরে রাখার প্রবক্তা তার চেয়ে বেশী আর কেউ নেই। বিশেষত একান্নবর্তী পরিবারের সে জোরালো সমর্থক। বর্তমানের বধূরা বড় পরিবারের সাথে মিলে থাকাকে যেভাবে ভয় পায়, তা দেশ ও জাতির জন্য অশনি সংকেত মনে করে শ্রীকণ্ঠ। এ কারণে অবশ্য গ্রামের বধূরা তাকে ভাল চোখে দেখে না। কোনো কোনো সম্ভ্রান্ত মেয়ে তো তাকে তার দুশমন মনে করে। এমনকি তার স্ত্রী পর্যন্ত তার সাথে এ নিয়ে অনেক উত্তপ্ত আলোচনা করে। তার স্ত্রীর কারণটি ভিন্ন। তার স্ত্রী তার শ্বশুর-শাশুড়ী, দেবর-ভাসুরকে অপছন্দ করে এমন নয়। বরং তার মতামত হলো— যদি নিজে সব টেনশন নিয়ে, সব কাজ নিজ করে দিয়েও পরিবারের সাথে মানিয়ে নেয়া না যায়। তাহলে প্রতিদিনের ঝগড়ার চেয়ে, জীবনকে তিক্ত করে তোলার চেয়ে আলাদা রান্না করেই খাওয়া ভাল।

আনন্দী এক উঁচু পরিবারের মেয়ে । তার পিতা এক ছোট রিয়াসাতের তালুকদার ছিল। আলিশান অট্টালিকা, একটি হাতি, তিনটি ঘোড়া, পাঁচজন উর্দিপরা সৈনিক, ঘোড়ার গাড়ি, শিকারী কুকুর, শিকারী পাখি,চিল,বাজ,বিছানাপত্র, কাঁচ, হাতিয়ার, অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট, ঋণ মোটকথা একটি মহামান্য তালুকদারের যে সব প্রয়োজন সব কিছুর সুবিধা-ই ছিল ভুপসিং তার নাম। হাসিখুশী, যোগ্য মানুষ। তবে ভাগ্যক্রমে একটা ছেলেও তার ছিল না। মেয়ের পর মেয়ে সাতজন জন্মেছে। সবাই জীবিত ছিল। তার সমান বা তার চেয়ে উঁচু পরিবারে তাদের বিয়ে দেয়া তার রিয়াসাতকে ধূলায় মিশিয়ে দেয়ার নামান্তর ছিল। প্রথমে আবেগে তিন মেয়ের বিয়ে মন খুলে দিয়েছেন। যখন পনের বিশ হাজার টাকা ঋণ হয়ে গেল, তখন তার চোখ খুললো। হাত গুটিয়ে নিল। আনন্দী ছিল চতুর্থ কন্যা। সে তার অন্যান্য বোনের তুলনায় সবচেয়ে সুন্দরী ও ভাল চরিত্রের। এজন্য ভুপসিং ঠাকুর তাকে অনেক বেশী আদর করে। ঠাকুর সাহেব অত্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দে ছিলেন তাকে কোথায় বিয়ে দিবেন। তিনি ঋণের বোঝা বাড়ৃক তা যেমন চাচ্ছিলেন না, আবার মেয়েটি নিজেকে দুর্ভাগী মনে করুক, এ সুযোগও দিতে চাচ্ছিলেন না। একদিন শ্রীকণ্ঠ কোনো চাঁদা নিতে তার কাছে এলো। সম্ভবত নাগরী প্রচারের চাঁদা। ভুপসিং তার চাল চলনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বাক বিতণ্ডা করে দিনক্ষণ মিলানো হলো। ধুমধামের সাথে বিয়ে হয়ে গেল।

আনন্দী দেবী নতুন বাড়িতে এসে এখানকার চালচলন একটু ব্যতিক্রম-ই পেল। যে আনন্দ আর বিলাসিতায় সে ছোটবেলা থেকে অভ্যস্ত ছিল এখানে তার অস্তিত্ব-ই নেই। হাতি ঘোড়া তো দূরে থাক, একটি সুসজ্জিত ছোট আকাকৃতির এক্কা গাড়িও নেই। রেশমি নীলপর সাথে নিয়ে এসেছিল কিন্তু এখানে তো কোনো বাগান-ই নেই। ঘরে জানালা পর্যন্ত ছিল না। মাটিতে গালিচা, দেয়ালে ছবিও ছিল না। শাদা-সিদে গ্রামীণ বাড়ি। আনন্দী অল্প দিনেই এসব পরিবর্তন তার সাথে মানিয়ে নিল। সবার সাথে আন্তরিকভাবে মিশে গেল। ফলে তার মনে হতো কোনোদিন কষ্ট-ই দেখেনি।

।।২।।

একদিন দুপুরের সময় লাল বিহারী সিং দুটি মুরগী নিয়ে এলো। তার ভাবীকে বলল, তাড়াতাড়ি গোশত রান্না করে দিও, আমার অনেক খিদে পেয়েছে। আনন্দী মূল রান্না শেষ করে তার জন্য অপেক্ষা করেছিল। গোশত রান্না করতে গেল তখন কৌটায় দেখলো ঘি এক পোয়ার চেয়ে বেশী নেই। বড় মেয়ে অল্প দিয়ে দেয়ার সবক ভাল করে পায়নি। সে সবটুকু ঘি গোশতে ঢেলে দিল। লাল বিহারী খেতে বসলো, তখন দেখলো, ডালে ঘি নেই। সে বলল, ‘ডালে ঘি দাওনি কেন?’

আনন্দী : আজ তো মাত্র এক পোয়া ঘি ছিলো। সবটুকু গোশতে ঢেলে দিয়েছি। যেভাবে শুকনো কাঠ খুব দ্রুত জ্বলে ওঠে, তেমনিভাবে ক্ষুধার্ত মানুষ ছোট ছোট ব্যাপারে ক্ষেপে যায়। লাল বিহারী সিং-এর কাছে ভাবীর এ গলা বাড়ানো খুব লাগলো। রেগে গিয়ে বলল,

‘তোমার বাপের বাড়িতে মনে হয় ঘি এর নদী বয়ে চলে!’

মেয়েরা গালি সহ্য করে নেয়, মারধর সহ্যকরে নেয়, কিন্তু বাপের বাড়ির নিন্দা সে সইতে পারে না। আনন্দী মুখ ভেংচিয়ে বলল, ‘হাতি মরলেও নয় লাখ। সেখানে এটুকু ঘি কুমার নাপিতরা প্রতিদিনই খায়।’

আনন্দীর রাগ চরমে উঠে গেছে। চেহারা লাল হয়ে গেছে বলল, তিনি যদি থাকতেন তাহলে আজ মজাটা দেখিয়ে দিতেন। এবার গোয়ার যুবক নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না।তারস্ত্রীর এক সাধারণ জমিদারের মেয়ে ছিল।যখন মন চাইতো তখন তার উপর হাত চালিয়ে দিতো। এবার আনন্দীর দিকে জোরে নিক্ষেপ করল আর বলল, যার ভরসায় তুমি ফুলে আছো তাকেও দেখে নিব আর তোমাকেও।

আনন্দী হাত দিয়ে খড়ম ফেরালো। মাথা বেঁচে গেল তবে আংগুলে প্রচণ্ড আঘাত পেল।রাগে গোস্বায় পাতার মতো থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে হাওয়ায় দুলে দুলে তার ঘরে গিয়ে দাঁড়ালো। স্ত্রীর শক্তি-ক্ষমতা, গর্ব-মর্যাদা তার স্বামী কেন্দ্রীক। স্বামীর শক্তি, স্বামীর সাহস তার অহংকার হয়। আনন্দী রক্ত হজম করে চুপ করে গেল।

।।৩।।

শ্রী কণ্ঠ সিং প্রতি শনিবার বাড়িতে আসে। বৃহস্পতিবারের এ কাহিনী। কোনো খাওয়া দাওয়া করল না। তার পথ চেয়ে থাকলো শেষ পর্যন্ত যথারীতি শনিবার সন্ধ্যায় সে এলো। বাইরে বসে দেশ-গ্রামের কথা বললো। কিছু নতুন শালিসের বিষয় শুনলো। সিদ্ধান্তও দিলো। কথা-বার্তা বলতে রাত দশটা বেজে গেল। প্রথম দু’তিন ঘণ্টা অত্যন্ত অস্থিরতায় কাটালো আনন্দী। রাতের খাবারের সময় হয়ে এলো। পঞ্চায়েত শেষ হলো। বৈঠকখানা যখন নীরব হলো তখন লাল বিহারী বললো, ‘ভাইয়া, আপনি ঘরে বলে দিবেন, একটু মুখ সামলে যেন কথা বলে। অন্যথা একদিন সত্য-সত্যই খুন খারাবি হয়ে যাবে।’

বেণীমাধব সিং তা সমর্থন করে বললেন, ‘পুরুষদের সাথে তর্ক করা বৌদের জন্য ভালো না।’

লাল বিহারী : সে বড় লোকের মেয়ে ঠিক আছে, আমরাতো আর কামার কুমার নই।

শ্রীকণ্ঠ : আরে, ব্যাপারকী?

লালবিহারী : কিছুই হয়নি। এমনিতে নিজে নিজ জ্বলে উঠলো। বাপের বাড়ির সামনে আমাদেরকে তো কিছুই মনে করেনা।

শ্রীকণ্ঠ খাওয়া দাওয়া করে আনন্দীর কাছে গেল। সেও গম্ভীর হয়ে বসে ছিল। এ বেচারাও কিছুটা রেগে ছিল। আনন্দী জিজ্ঞাসা করলো: শরীরটা ভালো তো?

শ্রীকণ্ঠ বলল, অ-নে-ক ভালো। আজকাল ঘরে তুমি কী ঝড় বইয়ে দিচ্ছ?

আনন্দী তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। রাগে গোস্বায় শরীর ঘেমে গেল। সে বলল, ‘যে আপনার কাছে এ আগুন লাগিয়েছে তাকে পেলে মুখ পুড়িয়ে দিতাম।’

শ্রীকণ্ঠ : এতো চটছো কেন? বিষয়টা তো খুলে বলবে?

আনন্দী : কী আর বলবো? ভাগ্য! না হলে একটা গণ্ডমূর্খ যে একটা চাপরাশির কাজ করার যোগ্যতাও রাখে না, সে আমাকে এভাবে খড়ম দিয়ে মেরে আবার ফুলিয়ে চলতে পারতো না। তার কান টেনে ছিড়ে ফেলতাম। তারপরও আপনি জিজ্ঞাসা করছেন, ঘরে ঝড় বইয়ে দিচ্ছি কেন?

শ্রীকণ্ঠ : বিস্তারিত বলোতো। আমি তো কিছুই জানি না।

আনন্দী : গতপরশু আপনার আদরের ভাই আমাকে গোশত রান্না করতে বলল। কৌটায় ঘি একপোয়া থেকে সামান্য বেশী ছিল। আমি পুরোটাই গোশতে ঢেলে দিলাম। যখন খেতে বসলো তখন বলল, ডালে ঘি নেই কেন? ব্যস, এতে-ই আমার বাপের বাড়ি তুলে গালি-গালাজ শুরু করলো। আমি সইতে পারিনি। আমিও বললাম, সেখানে এতটুকু ঘি নাপিত কুমাররা-ই খেয়ে থাকে। এটা কেউ খোঁজও রাখে না। ব্যস এতটুকু কথাতেই এ জালিম আমার দিকে খড়ম ছুঁড়ে মারলো। আমি যদি হাত দিয়ে না ফেরাতাম তাহলে মাথা ফেটে যেতো। তাকেই জিজ্ঞেস করুন, আমি যা বলেছি তা সত্য নাকি মিথ্যা?

শ্রীকণ্ঠের চোখ লাল হয়ে গেল। সে বলল, এতো বেড়ে গেছে। এতো দেখি অনেক খারাপ হয়ে গেছে।

আনন্দী কাঁদতে লাগলো। এটা তো মেয়েদের অশ্রু—পুরুষের রাগে তেল ঢেলে দেয়ার কাজ দেয়। শ্রীকণ্ঠ সহনশীল মানুষ। সম্ভবত সে কখনো রাগ করেনি। তবে আজ আনন্দীর অশ্রু বিষাক্ত পানীয়ের মতো প্রভাব ফেললো। সারা রাত এ পাশ ওপাশ করে কাটালো। সকাল হতেই তার বাবার কাছে নিয়ে বলল, ‘বাবা, এ বাড়িতে আমার আর জায়গা হবে না।’

এ কথা বা এ ধরনের আরও কোনো কথা বলার কারণে শ্রীকণ্ঠ তার বন্ধুদেরকে কতবার যে গালমন্দ করেছে। যখন তার কোনো বন্ধু তাকে এমন কথা শুনাতো তখন সে তা নিয়ে হাসি তামাশা করতো। আর বলতো, তোমরা দেখি বৌয়ের গোলাম হয়ে গেছ। তাদেরকে আয়ত্বে রাখার পরিবর্তে তোমরা নিজেরাই তাদের আয়ত্বে চলে যাচ্ছ। আজ কিন্তু হিন্দু একান্নবর্তী পরিবারের প্রবক্তা তার বাবাকে নিজেই বলছে-‘ বাবা! এ বাড়িতে তো আর আমার জায়গা হবে না ।’

উপদেশ দাতার ভাষা তখন পর্যন্ত চলে যতক্ষণ সে ভালোবাসার কারসাজি থেক বেখবর থাকে। ঠিক পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণ শক্তি আর জ্ঞান-বুদ্ধি অনেক সময় বিদায় নেয়।

বেণী মাধব সিং পেরেশান হয়ে জিজ্ঞসা করলো, ‘কেন?’

শ্রী কণ্ঠ : কারণ আমারও তো মান সম্মান আছে? আপনার বাড়িতে বাড়াবাড়ি চলে। যে বড়দের প্রতি আদব দেখানোর কথা সে-ই বড়দের মাথায় চড়ে বসে। আমি তো অন্যের কৃতদাস হয়ে গেলাম। আমি বাড়িতে থাকি না। এখানে আমার অবর্তমানে বৌয়ের উপর খড়ম আর জুতা বর্ষণ হয়। কড়া কথা বলবে, ঠিক আছে। দুয়েকটা কথা শুনিয়ে দিবে, তাও মেনে নেয়া যায়, কিন্তু আমাকে লাথি ঘুষি মারবে আর আমি সয়ে যাব তাতো হতে পারে না।

বেণী মাধব সিং কোন জবাব দিতে পারলেন না। শ্রীকণ্ঠ সবসময় তাকে সম্মান করেই কথা বলে। তার এমন রাগ দেখে বুড়াঠাকুর বাকরুদ্ধ। শুধু এটুকু বললেন, ‘বাবা! তুমি বুদ্ধিমান হয়ে একথা বলছো? মেয়েরা এভাবে সংসার ধ্বংস করে দেয়। তাদের প্রশ্রয় দেয়া ভাল না।’

শ্রীকণ্ঠ : এসব আমি জানি। আপনার দুয়ায় আমি এতো আহাম্মক নই। আপনি নিজেও জানেন গ্রামের কয়েকটি পরিবারকে আলাদা হবার ঝামেলা থেকে বাঁচিয়েছি। তবে ঈশ্বরের দরবারে যে নারীর মান-সম্মানের দায়িত্বশীল আমি, সেই নারীর সাথে এমন নির্যাতনমূলক আচরণ আমি করতে পারি না। আপনি বিশ্বাস করেন, আমি আমাকে অনেক নিয়ন্ত্রণ করছি। লাল বিহারীর কান টেনে দেইনি।

এবার বেণী মাধব সিং-ও গরম হয়ে গেলেন। এ ঔদ্ধত্যের প্রতি কর্ণপাত না করে তিনি বললেন, লাল বিহারী তোমার ভাই। যখন সে ভুল করবে অবশ্যই তার কান মলে দিবে। তবে…

শ্রীকণ্ঠ: লাল বিহারীকে এখন আমার ভাই মনে করি না।

বেণী মাধব সিং : মেয়েদের পাল্লায় পড়ে!

শ্রীকণ্ঠ : জি, না। তার বেয়াদবি আর নির্দয়তার কারণে।

উভয়েই অনেকক্ষণ চুপ থাকলো। ঠাকুর মহাশয় ছেলের রাগ কিছুটা হালকা করতে চাচ্ছিলেন। তবে এটাও মানতে রাজি ছিলেন না—তার লাল বিহারী কোনো বেয়াদবি বা নির্দয় কোনো কাজ করেছে। এ সময় কয়েকজন লোক হুক্কা তামাক পান করার জন্য এসে বসলো। কয়েকজন মহিলা যখন শুনলো শ্রীকণ্ঠ নিজেই বৌয়ের পক্ষ নিয়ে বাপের সাথে যুদ্ধাংদেহী অবস্থায় আছে তখন তারা মনে মনে খুবই খুশী হলো। আর উভয় পক্ষের অভিযোগপূর্ণ কথাগুলো শোনার জন্য ব্যকুল হয়ে গেলো। কিছু হিংসুক সে গ্রামে ছিল, যারা এর পরিবারের শান্তি দেখে মনে মনে জ্বলছিলো। যারা মনে করতো শ্রীকণ্ঠ তার পিতার সাথে তর্ক করেছে এটা তার অপরাধ। শ্রীকণ্ঠের এতো লেখাপড়া করাটাও ভুল। বেণীমাধব সিং বড় ছেলেকে অনেক স্নেহ করেন, এটা তার অন্যায়। তিনি তার পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করেন না। এটা তার নির্বুদ্ধিতা। এ ধরনের মানসিকতার লোকদের আজ আশাপূর্ণ হচ্ছে। হুক্কা পান করার বাহানায়, কেউ খাজনার রশিদ দেখানোর কৌশলে এসে বসে গেল। বেণীমাধব সিং বয়স্ক মানুষ। বুঝে গেলেন আজ একে থামানো কঠিন। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন বাইরের লোকদের হাত তালি দিতে দিব না। এজন্য যতই কষ্ট করতে হয় হোক।এক পর্যায়ে কথা বলার স্টাইল নরম করে নিয়ে বললেন, ‘বাবা! আমি তোমার পর নই। তোমার মন যা চায় তা কর। এবার ছেলেটার ভুল হয়ে গেছে।’

এলাহাবাদের গ্রাজুয়েট রাগী যুবক এ পরিস্থিতি বুঝলো না। ডিবেটিং ক্লাবে অন্যের যুক্তি খণ্ডনের অভ্যাস গড়েছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনের আলোচনার কৌশল সম্পর্কে অবগত ছিল না। এ ময়দানে সে আনাড়ী-ই বুঝা গেল। পিতা যে উদ্দেশ্যে প্রসঙ্গ পাল্টালেন, সে দিকে তার নজরই পড়লো না। সে বলল, ‘আমি লাল বিহারীর সাথে এ বাড়িতে থাকতে পারব না।’

পিতা : বৎস! তুমি বুদ্ধিমান মানুষ গোয়ারদের কথায় কান দেয় না। সে অবুঝ ছেলে। তার যা ভুল হয়েছে, তুমি বড় হিসেবে তাকে মাফ করে দাও।

পুত্র : তার এ ধরনের বাড়াবাড়ি কিছুতেই মাফ করতে পারব না। হয়তো সে এ বাড়িতে থাকবে, না হয় আমি-ই থাকব। আপনি যদি তাকেই বেশী পছন্দ করেন তাহলে আমাকে বিদায় দিন। আমি আমার দিন দেখব। আর যদি আমাকে রাখতে চান তাহলে তাকে বলে দিন যেখানে খুশী সেখানে চলে যাক। এটা-ই আমার শেষ কথা।

লাল বিহারী দরজার চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ভাইয়ের কথা শুনছিলো। সে ভাইকে অনেক সম্মান করতো। তার কখনও সাহস হয় নি। শ্রীকণ্ঠের সামনে খাটে বসার, কিংবা হুক্কা পান করার অথবা পান না খাওয়ার। নিজের বাবাকেও এতো আদর লেহাজ করতো না। শ্রীকণ্ঠও তাকে মন থেকে ভালবাসতো। তার জানামতে লাল বিহারীকে সে কখনও ধমক পর্যন্ত দেয়নি। এলাহাবাদ থেকে বাড়ি আসার সময় অবশ্যই তার জন্য কিছু উপঢৌকন নিয়ে আসতো। ম্যাগডোরের একসেট জামা তাকে বানিয়ে দিয়েছিলো। গতবছর নাগ পঞ্চমির উৎসবে কুস্তি খেলায় তার চেয়ে দেড়গুন বড় যুবককে যখন হারিয়ে দিলো তখন খুশী হয়ে মঞ্চে গিয়ে তাকে গলা জড়িয়ে ধরেছিল। পাঁচ টাকা তাকে পুরস্কার দিয়ে ছিল। এমন প্রিয় ভাই থেকে লাল বিহারী সিং এ হৃদয় বিদারক কথা শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে পড়লো। সে একটুও রাগ করলো না। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। এতে কোনো সন্দেহ নেই, এখন লাল বিহারী তার কাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জিত। ভাই আসার একদিন পূর্বেও মনে মনে ভয় পাচ্ছিল, ভাইয়া জানি কী বলে? আমি তার সামনে কীভাবে যাব? আমি তার সাথে কীভাবে কথা বলবো। আমি তার সামনে চোখ উঠিয়ে তাকাব কীভাবে? সে ভেবেছিল ভাইয়া ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে দিবে। এসব ভাবনার বিপরীতে তার ভাইকে অত্যন্ত রাগান্বিত-ই দেখছে। সে মূর্খ ছিল, তবু তার মন বলছিল, ভাইয়া আমার সাথে বাড়াবাড়ি করছে। যদি শ্রীকণ্ঠ তাকে নির্জনে ডেকে নিয়ে দুচারটে শক্ত কথা শুনিয়ে দিতো কিংবা দুচারটা চড় মারতো তাহলেও সে এতো মর্মাহত হতো না। কিন্তু ভাইয়ার একথা বলা যে, ‘ তাকে আমি দেখতে চাই না।’এটা লালবিহারীর জন্য অসহ্য ছিলো। সে কেঁদে কেঁদে বাড়িতে ঢুকলো, তার রুমে গিয়ে কাপড় পাল্টালো। চোখ মুছলো। যেন কেউ না বুঝে সে কাঁদছিল। এবার আনন্দী দেবীর ঘরের দরোজায় এসে বললো, ‘ভাবী! ভাইয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি আমার সাথে থাকবে না। তিনি আমার চেহারা দেখতে চান না। তাই আমি যাচ্ছি। তাকে আর মুখ দেখাবো না। আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন।’ এসব বলতে বলতে লাল বিহারীর গলা ভারী হয়ে এলো।

।।৪।।

লাল বিহারী যখন মাথা নত করে আনন্দীর দরোজায় দাঁড়িয়েছিল তখন শ্রীকণ্ঠও চোখ লাল করে বাইরে থেকে এলো। ভাইকে দাঁড়ানো দেখে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল। পাশা কাটিয়ে চলে গেল। মনে হচ্ছিল তার ছায়াটাও মাড়াতে চাচ্ছে না।

আনন্দী তার স্বামীর কাছে লাল বিহারীর ব্যাপারে অভিযোগ করেছিলো ঠিক-ই, কিন্তু এখন মনে মনে আফসোস করছে। সে ভাল মানসিকতার নারী। সে ভাবতেও পারেনি বিষয়টি এতটুকু গড়াবে। সে মনে মনে স্বামীর উপর ক্ষেপছিলো, তিনি এতো রাগ দেখাচ্ছেন কেন? এটাও ভয় পাচ্ছিল, শ্রীকণ্ঠ আবার আমাকে এলাহাবাদ যাবার কথা বলে বসে কিনা? যদি বলেই বসে তখন আমি কী করব? এসব চিন্তায় তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। এ অবস্থায় সে যখন লাল বিহারীকে দরোজায় দাঁড়িয়ে বলতে শুনলো, ‘আমি এবার যাচ্ছি। মনের দাগ মুছে দেয়ার জন্য অশ্রুর চেয়ে বেশী কার্যকর আর কিছুই নেই।

শ্রীকণ্ঠকে দেখে আনন্দী বলল, ‘লালু বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক কাঁদছে।’

শ্রীকণ্ঠ : তাহলে আমি কী করব?

আনন্দী : ভেতরে ডেকে আনেন। আমার জিভ পুড়ে যাক। আমি কোথা থেকে এ ঝগড়া নিয়ে এলাম?

শ্রীকণ্ঠ : আমি ডাকতে পারব না।

আনন্দী : পরে আফসোস করবেন। সে অনেক অনুতপ্ত। বলা যায় না কোথাও চলে যেতে পারে।

শ্রীকণ্ঠ আর উঠলো না। ইতোমধ্যে লাল বিহারী আবার বলল, ভাবী! ভাইয়াকে আমার সালাম জানাবেন তিনি আমার মুখ দেখতে চাচ্ছেন না, তাই আমার মুখও তাকে দেখাব না।

লাল বিহারী এসব বলে ঘুরে দাঁড়ালো। দ্রুততার সাথে বাইরের গেটের দিকে যেতে লাগলো। এবং আনন্দী নিজের ঘর থেকে বের হয়ে তার হাত ধরে ফেলল।

লাল বিহারী পিছনের দিকে তাকালো। চোখে অশ্রু নিয়ে বলল, ‘ আমাকে যেতে দিন।’

আনন্দী : কোথায় যাবে?

লাল বিহারী : যেখানে আমার মুখ কেউ দেখবে না।

আনন্দী : আমি তোমাকে যেতে দিব না।

লাল বিহারী : আমি আপনাদের সাথে থাকার উপযুক্ত না।

আনন্দী : তোমাকে আমার দিব্যি দিচ্ছি। তুমি এক কদমও সামনে বাড়াবে না।

লাল বিহারী : আমার ব্যাপারে ভাইয়ার মন যতক্ষণ পরিষ্কার না হচ্ছে ততক্ষণ এ বাড়িতে আমি কিছুতেই থাকব না।

আনন্দী : আমি ঈশ্বরের দিব্যি দিচ্ছি, তোমার ব্যাপারে আমার মনে কোনো কষ্ট নেই। এবার শ্রীকণ্ঠের মন গলে গেল। সে বাইরে এসে লাল বিহারীকে গলায় জড়িয়ে ধরলো। দু’ভাই ফুপিয়ে ফুপিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলো। লাল বিহারী কান্নায় হেচকি দিয়ে বলল, ভাইয়া! আপনি কখনও বলবেন না, তোমার মুখ দেখব না, এ ছাড়া যে কোনো শাস্তি দিবেন তা সানন্দে মেন নিব।

শ্রীকণ্ঠ কাঁপা কণ্ঠে বলল, লাল্লু এসব কথা ভুলে যা। ঈশ্বর চাইলে আর এসব বিষয় প্রয়োজন হবে না। বেণীমাধব সিং বাইরে থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন। দুভাইকে এভাবে গলা জড়িয়ে থাকতে দেখে খুশী হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, বড় ঘরের মেয়েরা এমন-ই হয়। এলোমেলো অবস্থা সামাল দিতে পারে।

গ্রামে যে লোকই এ কাহিনী শুনলো সবাই আনন্দীর উদারতার প্রশংসা করলো। ‘বড় ঘরের মেয়েরা’ এমনই হয়।

– See more at: http://bm.thereport24.com/article/137496/index.html#sthash.UpNcWb33.dpuf

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 159 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*