Home » তথ্য-প্রযুক্তি » ফেসবুক সেলেব্রেটি ম্যানিয়া ও কেনা লাইক

ফেসবুক সেলেব্রেটি ম্যানিয়া ও কেনা লাইক

মুনজের আহমদ চৌধুরী: সেলেব্রেটিময় এখন চারপাশ। দেশে ১ হাজার টাকায় পাঁচ-দশ হাজার লাইক মৌসুমে অনেকে লাখ লাখ লাইক কিনে এখন মোটামুটি প্রতিষ্টিত, ধর্নাঢ্য (!) ফেসবুক সেলেব্রেটি। অনেকে আবার স্পন্সর এ্যাডে লাইক কেনেন। সেলেব্রেটি শব্দের অর্থ দাড়ায় সন্মানিত, শব্দটির উৎপত্তি রোমের প্রাচীন ল্যাটিন ভাষা থেকে। টাকা দিয়ে লাইক কেনা গেলেও খ্যাতি,সন্মান আর মানুষের ভালবাসা কি কেনা যায়? ফেসবুক সেলেব্রেটিরা বোধকরি নিজের বড়ত্ব স্ব-প্রচারনায় জানান দিতে গিয়ে নিজের ক্ষুদ্রতাকেই ব্যাপকতা দেন। কিন্তু, বাস্তবতা হলো- স্যোশাল মিডিয়ার বা প্রধানত ফেসবুকের বড়ত্ব ,তারা সমাজে অধিষ্টিত করতে পারছেন না সাধারন মানুষের কাছে। পেজে আড়াই লাখ লাইক কিন্তু ঢাকা সিটির নির্বাচনে দাড়ালে ব্যালট বাক্সে ভোট পড়ে না আড়াই হাজারও। সবার কথা বলছি নাৃ। কিন্তু ব্যাতিক্রম তো বাস্তবতার নেতিবাচকতার ব্যাপকতা অতিক্রম করতে পারে না।
অথচ, ফেসবুকের লাইক গুনবার, বাড়াবার সংস্কৃতির বিকৃতির বাইরের বাতায়নে প্রযুক্তির হাত ধরে আলো আভা কিন্তু অবারিত।
অনেক মালওয়ালা সেলেব্রেটির ফেসবুক পেজ ভেরিফায়েড করিয়ে এনেছেন কত ঝক্কি-ঝামেলা, পেপ্যাল-ক্রেডিটকার্ডের মামলা পেরিয়ে। এখন রীতিমত মাসোহারা দিয়ে লোকবল নিযুক্ত করেছেন নিজের প্রসূত বানী বন্দনা আর অর্চনায়। চাকুরীদাতা গুরুর চাকুরীজীবি শিষ্যরা তাই গুরুর সামাজিক সক্ষমতা আর ক্ষমতার উত্তরোত্তর প্রসারে তারা তাদের কর্মকুশলতায় অটোলাইক আর শেয়ারে স্বয়ং ফেসবুক আর মার্ক জুকারবার্গও তাদের সমীহ করেন !

বিশ্বায়নের বিকাশের যাত্রায় সংবাদ যেমন পন্য হলেও সাংবাদিকতাকে পন্য বলে গন্য করা অত্যান্ত অসমীচীন; তেমনি জনপ্রিয়তার নামে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় রাজা-উজির মারলেই কী স্বার্থকতা আসে? অনেকে বাংলায় টাইপ করতে না জানলেও ফেসবুকে বঙ্গ ভাষায় ষ্টেটাসের বন্যায়,ভাসিয়ে দেন সকল অন্যায়। দু-দিন আগে ফেসবুকে কয়েক শব্দের একটা ষ্টাটাস লিখেছিলাম-কিছু উপেক্ষা,প্রিয়-র প্রত্যাক্ষান;রূপে প্রেরণার-হয় সাফল্যের আখ্যান। সকালে উঠে দেখি অন্তত তিন বন্ধুর দেয়ালে কপি-পেষ্ট! বন্ধুতালিকার বাইরের কতজনের ওয়ালে সেই ষ্টাটাসখানি তাদের স্ব-কীর্তিতে স্থান পাচ্ছে সেটি না দেখতে যাওয়াই বুঝি সংগত! অথচ তারা শেয়ার করতে পারতেন, সুত্র উল্লেখ করলে তাতে করে কি তারা ছোট হয়ে যেতেন। একই অবস্থা নিউজের ক্ষেত্রেও। সর্বত্রই চৌর্যবৃত্তির কী রকমারী কীর্তি। অনলাইনের অন্ত:জালে চোরেদের কীর্তি দেখে একসময় রাগ করতাম,এখন গা সওয়া হয়ে গেছে।
ফেসবুকে সাকিরা জুইঁ,ড্যানিয়েল আহমেদের মতোন দু-চারজন প্রিয় বন্ধু যখন আমার বা অন্য কারো একটা লেখা কার্টেসী বাই অমুকৃ লিখে শেয়ার করেন,তখন তাঁর বা তাদেঁর প্রতি শ্রদ্ধাই জাগে। মননশীলতা আর সৃষ্টিশীলতাকে শ্রদ্ধা করবার চর্চা আজ সুদূরপরাহত।
নি:সংকোচে বলি ,আমিও ফেসবুকে নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ব্যাপ্তি বন্ধুদের জানাই। শেয়ার করি আনন্দ-বেদনার স্থির-অস্থির চিত্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতোন মাধ্যমগুলোকে যে যার রুচিবোধে ব্যাবহার করবেন এটিই স্বাভাবিক। আর স্যোশাল মিডিয়াগুলোকে তো স্যোশাল বিজনেসের কৌশলী খামার হিসেবে তৈরীই করেছেন এর উদ্যোক্তারা।
পাঠক,আজকের লেখার গন্তব্য কিন্তু সেই আলোচনা নয়। গত কিছুদিন ধরেই আমার কাছের কিছু বন্ধুরা ফেসবুকে আমার সকাতরে আর অ-কাতরে লাইক বাটন চাপার বিরোধীতা করছেন! তাঁরা আমার একান্তই আমার শুভাকাংখী হিসেবে বলছেন, আমার লাইক চাপার সাথে সাথে আমার একাউন্ট আর পেজের বন্ধুদের হাজার হাজার দেয়ালে ফেসবুক দেখিয়ে দিচ্ছে আমি লাইক দিচ্ছি কার ছবিতে। হ্যা, যে ছেলেটি দেশে থাকতে আমার গাড়ি নয়তো বাইক সারাইয়ের কাজ করতো ওয়ার্কশপে,নয়তো সবেমাত্র পা রেখেছে মফস্বলী সাংবাদিকতায়, তাদের ছবিতে-পোষ্টে পরবাসের ব্যাস্ততার ব্যাতয়ে কমেন্ট না করতে পারলেও লাইক দিই। ভালো যে কোন,যে কারো উদ্যোগে অর্থ দিয়ে সাহায্য করবার সামর্থ সবসময় না থাকলেও সমর্থন করতে দোষ কোথায়।

যে দেশে বড় নেতা, বিরাট শিল্পীরা (!) ফেসবুকে ১ হাজার টাকায় পাচঁ-দশ হাজার লাইক কেনেন, সেখানে আমার মতোন ক্ষুদ্র মানুষের লাইকে যদি আমার একজন অনুজ-সুহৃদ এক মুহুর্তের জন্যও জন্যও আনন্দিত হন- সেটিই আমার পরম পাওয়া। বন্ধুতালিকায় থাকা সেলেব্রেটিরা যদি আমার এমন আচরনে বিব্রত হন এতে তাহলে তারা এক ক্লিকেই বিনা সংকোচে আমাকে আনফ্রেন্ড করে বাধিত করতে পারেন। কিছু কিছু বিকারগ্রস্থ স্ব-বড়ত্ববিদ মনে করেন, গায়েঁর এক তরুনের ছবিতে ভুল বাক্যে লেখা আবেগময় ষ্টাটাসে লাইক করলেই তার বড়ত্বের ক্ষতি হবে, উল্টো স্বীকৃতি দেয়া হবে সেই ছেলেটাকেৃসেই বড়ত্বকে আমি ঘৃনা করি। হায় কী বিভীষিকা বড়ত্বের!

 

আমি আমার যোগ্যতা সম্পর্কে সচেতন, সচেতন আমার স্ব-ক্ষুদ্র উচ্চতার ব্যাসার্ধ্য নিয়েও। দেশে থাকতে, আমি পারতপক্ষে রিক্সায় চড়তাম না, বাহনটিকে বড্ড অমানবিক মনে করে যাত্রার সময়টুকু বেদনায় আচ্ছন্ন রাখতো আমায়। রিক্সায় চড়লে ফুটপাতের চায়ের দোকানে বসে যে রিক্সার যাত্রী আমি সেই রিক্সাচালকের সাথে বেঞ্চে বসে চা-বিস্কুট খাওয়া মানুষের দলে আমার বাস। পরম করুনাময় তো আমার হাতে রিক্সার হ্যান্ডেল ধরিয়ে আমার রিক্সাচালক ভাইটিকে রিক্সার যাত্রী করতেই পারতেন অবলীলায়। সেখানে আমার আর সেলেব্রেটির নামে সং সাজবার কী- দরকার। ভালবাসা,বিশ্বাস আর খ্যাতি তো আর বিত্তের দ্যুতিতে কেনা যায় না।
লেখক-যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক,বার্তা সম্পাদক চ্যানেল আই ইউরোপ।

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 111 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*