Home » জাতীয় » নিজামীর পূর্ণাঙ্গ রায় ট্রাইব্যুনালে, মৃত্যু পরোয়ানা রাতেই

নিজামীর পূর্ণাঙ্গ রায় ট্রাইব্যুনালে, মৃত্যু পরোয়ানা রাতেই

ঢাকা: মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় গেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

আইন অনুসারে বিচারিক আদালত ট্রাইব্যুনাল মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠাবেন। এ পরোয়ানার ভিত্তিতে দেশের শীর্ষ এই দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকরে পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করবে কারা কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) রাত ছয়টা ৫৫ মিনিটে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে পূর্ণাঙ্গ রায়টি। রায়ের অনুলিপিসহ অন্য কাগজপত্র পাঠান সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। সেগুলো নিয়ে ট্রাইব্যুনালে পৌঁছান ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেল অরুনাভ চক্রবর্তী।

গোছানো ও আনুষঙ্গিক কাজ শেষে সেগুলো গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. শহীদুল আলম ঝিনুক। এর ভিত্তিতে রাতেই ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবেন বলে জানিয়েছেন রেজিস্ট্রার।  এ লক্ষ্যে চেোরম্যান ও বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ট্রাইব্যুনালে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এর আগে বিকেলে ১৫৩ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ আপিল মামলার রায় প্রদানকারী চার বিচারপতি রায়ে স্বাক্ষরের পর তা প্রকাশিত হয় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে। অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা।

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ আবেদন করতে ১৫ দিনের সময় পাবেন আসামিপক্ষ। বুধবার থেকে এ ১৫ দিনের ক্ষণ গননা শুরু হবে। এ সময়ের মধ্যে কেউ রিভিউ আবেদন না করলে আইন অনুসারে দণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু করবে সরকার।

অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, রিভিউ হলে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত থাকবে। রিভিউ খারিজ হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়া ফের শুরু হবে। সেক্ষেত্রে সর্বশেষ সুযোগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে অপরাধ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন আসামি। প্রাণভিক্ষার আবেদন না করলে কিংবা আবেদন করার পর নাকচ হয়ে গেলে চূড়ান্তভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হবে।

গত ০৬ জানুয়ারি দেশের এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সংক্ষিপ্ত আকারে চূড়ান্ত রায় দেন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। রায়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ একাত্তরে গণহত্যা ও ধর্ষণের দায়ে আলবদর বাহিনীর শীর্ষনেতা নিজামীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে করা তার আপিল আবেদন আংশিক খারিজ করে দেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নিখিল পাকিস্তানের সভাপতি হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন নিজামী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ছাড়াও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) হিসেবে আলবদর বাহিনী ও ছাত্রসংঘের অপরাধের দায়ও তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে রায়ে।

নিজামীকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং হত্যা-গণহত্যা ও ধর্ষণসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) প্রমাণিত ৮টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে ৪টিতে ফাঁসি ও ৪টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ৩টিতে ফাঁসি ও ২টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। অন্য তিনটিতে চূড়ান্ত রায়ে দণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন নিজামী, যার মধ্যে একটিতে ফাঁসি ও দু’টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

ট্রাইব্যুনালে নিজামীর বিরুদ্ধে মোট ১৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৮টি অর্থাৎ ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

প্রমাণিত চারটি অর্থাৎ সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়িসহ দু’টি গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে গণহত্যা ও প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ (২ নম্বর অভিযোগ), করমজা গ্রামে ১০ জনকে গণহত্যা, একজনকে ধর্ষণসহ বাড়ি-ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ (৪ নম্বর অভিযোগ), ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে গণহত্যা (৬ নম্বর অভিযোগ) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (১৬ নম্বর অভিযোগ) দায়ে নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

এর মধ্যে ৪ নম্বর অভিযোগের দায় থেকে নিজামীকে খালাস দিয়ে বাকি তিনটিতে ফাঁসি বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।

অন্য চারটি অর্থাৎ পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিন হত্যা (১ নম্বর অভিযোগ), মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র (৩ নম্বর অভিযোগ), বৃশালিখা গ্রামের সোহরাব আলী হত্যা (৭ নম্বর অভিযোগ) এবং রুমী, বদি, জালালসহ সাত গেরিলা যোদ্ধা হত্যার প্ররোচনার (৮ নম্বর অভিযোগ) দায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

এর মধ্যে ১ ও ৩ নম্বর অভিযোগের দায় থেকে চূড়ান্ত রায়ে খালাস পেয়েছেন নিজামী। বাকি দু’টিতে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ বহাল রয়েছে।

এ নিয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ফাঁসির তৃতীয় চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ রায় দিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। যার মধ্যে একাত্তরের আলবদর প্রধান ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান প্রধান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। অন্য একটি রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী হত্যার দুই ঘাতক জামায়াত নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিন পলাতক থাকায় কাদের দণ্ড কার্যকর করা যায়নি।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন নিজামীকে।

এ রায়ের বিরুদ্ধে ২৩ নভেম্বর আপিল করেন নিজামী। ছয় হাজার ২শ’ ৫২ পৃষ্ঠার আপিলে মোট ১শ’ ৬৮টি কারণ দেখিয়ে ফাঁসির আদেশ বাতিল করে খালাস চেয়েছিলেন তিনি।

তবে সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় আপিল করেননি রাষ্ট্রপক্ষ।

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 43 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*