Home » অন্যান্য » শিল্প ও সাহিত্য » নিজেকে খুঁজি অস্তিত্বে

নিজেকে খুঁজি অস্তিত্বে

 

ধরুন, নিজেকে হারিয়ে ফেললেন আপনি, তারপর হঠাৎ একদিন চমকে উঠলেন অচেনা কাউকে দেখে! এত চেনা এই মানুষটি কে? একসময় দেখলেন, আপনিই খুঁজে পেয়েছেন আপনাকে! এরপরেও কথা থাকে—আপনার মনে হতে পারে, এই কি সেই হারিয়ে যাওয়া আমি? আমার চেহারা এভাবে বদলে গেল কেন? ওই রং তো আমার নয়, মুখে ছিল না কোনো রেখার আঁকিবুঁকিও, তাহলে ও কে? উত্তর আসে, পথ চলো অথবা ঘরে থাকো—সব অবস্থায় তোমার আছে এক চলমান গতি; আর তার মধ্যেই আছে নানা রং ও নানা রঙের স্পর্শ।

এই যে আপনার নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন—এর সারবস্তু হলো, প্রতিনিয়ত নিজেকে, নিজের সত্তাকে চিনতে হয় নতুন করে। সোহেল রানা প্রাণন সেই তরুণ শিল্পীদের অন্যতম, যাঁরা নিজের শিল্পের মধ্যে খুঁজে ফিরছেন জাতির শিকড় আর নিজের চেহারা।

এই প্রচেষ্টার কিছু নমুনা দেখা গেল তাঁর ‘অস্তিত্ব’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীতে যদিও তিন ধরনের কাজ আছে, তথাপি এই আলোচনায় আমরা শিল্পীর একটি বিশেষ ধারার কাজকে প্রাধান্য দেব, যা তাঁর প্রদর্শনীর শিরোনামকে সার্থক করেছে।

তিন ধারার কাজের মাধ্যমগত পার্থক্যও আছে। একটি ধারা রচিত হয়েছে তেলরঙে ভূদৃশ্য, যা একপ্রকার অনুশীলন নাকি নিজের দেশকে দেখার নিজস্ব পন্থা, স্পষ্ট নয়। কাজগুলোতে যে দক্ষতার প্রকাশ ধরা পড়ে, তা ব্যক্তিগতভাবে শিল্পীর দেখার ধরন। তবে তেলরং মাধ্যমের যে জৌলুশ আছে, সেটি এখানে অনুপস্থিত।

দ্বিতীয় পর্বটি হচ্ছে মুখচ্ছবি বা পোর্ট্রেট সিরিজ। এখানে আছে বাংলার কৃতী মনীষীদের মুখচ্ছবি। এই কাজগুলো শিল্পীর প্রাতিষ্ঠানিক করণকৌশলগত দক্ষতার নিদর্শনও বটে।

এবার আসা যাক সোহেলের প্রধান কাজগুলোর আলোচনায়।

আমাদের দেশসহ উপনিবেশ-উত্তর দেশগুলোর প্রধান প্রবণতা হলো, ঐতিহ্যের ভিত খুঁজে না পাওয়া; এবং ঐতিহ্য হিসেবে যা পাওয়া যায়, দেখা যায় তা-ও রয়েছে নানা পূর্বশর্তের আবর্তে। এই ‘পূর্বশর্ত’ আমাদের নির্দেশ করে নিজের ঐতিহ্যকে বিদেশির মনন দিয়ে দেখতে। এখানে বলা ভালো, উত্তর-উপনিবেশ গুরুচণ্ডালী দ্বারা আক্রান্ত ছিল বেঙ্গল স্কুলও। আমাদের আলোচ্য শিল্পীর শিল্প-চেতনায় এসব উপাদান উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তিনি একটি ভিন্নতর ভাষা সৃষ্টি করতে সামর্থ্য হয়েছেন, যা আমাদের নিকট অতীতের বহু উপাদানকে একত্র করে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে, পাশাপাশি সমকালের সঙ্গে ঐতিহ্যের।

প্রথমে বলা যাক ‘আদমের দেশে’ শিরোনামে ছবির কথা। এই কাজের মধ্যে সোহেলের আগের কাজের সর্পিল জমাটবাঁধা ফর্মগুলোর একটা যোগসূত্র আছে। আবার সেহেল ২০১৩ সালে প্রথম যে প্রদর্শনী করেছিলেন, সেখানে স্থানীয় ফর্মকে সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য তাঁর মধ্যে যে প্রচেষ্টা ছিল, তারই পরিপক্ব রূপ কি আমরা এই প্রদর্শনীতে দেখছি? কিছুটা হয়তো তা-ই।

শিল্পীর এবারের ছবিগুলোর মধ্যে আমাদের অনেক অগ্রজের ছাপও লক্ষণীয়। যেমন ‘ফুলের গতি’ ছবিতে দেখি রফিকুন নবীর কিছু উপাদান সাবলীলভাবে প্রবেশ করেছে এর মধ্যে। তবে ‘সম্পর্ক’ শীর্ষক ছবিতে যখন হাঁসসহ একজন গৃহস্থকে দেখতে পাই আমরা, দেখি সেই অঙ্কনের মধ্যে রয়েছে সোহেলের স্বকীয়তা।

এই শিল্পীর আগের কাজকর্মের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানেন, তিনি একজন ছাপচিত্র অ্যাকটিভিস্ট। স্টুডিওতে নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের নিয়ে নিয়মিত নানা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তাঁর বর্তমান কাজে যে পরিপক্ব দৃষ্টি নান্দনিক বিষয়াদি এখন দেখা যায়, এর একটি প্রধান উপাদান উডকাটের লাইন।

আর এই উপাদানই সোহেলের ছবিকে নিয়ে গেছে ভিন্নতর অবস্থানে। তবে আরেকটু ‘পলিশ’ হলেই বোধ হয় এটি ক্রাফটের পর্যায়ে চলে যেত। এখানে স্পষ্টই বোঝা যায়, শিল্পীর পরিমিতি।

সোহেলের অর্জনের আরও একটি বিশেষ জায়গা হলো অ্যাক্রিলিক রং ব্যবহারের দক্ষতা। এ ছাড়া তাঁর আরেকটি দিক হলো, নিজের নির্মাণশৈলীতে কালীঘাটের পটচিত্রের সঙ্গে আমাদের সমকালীন ‘মাস্টার’ শিল্পীদের শিল্প-অভিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি। তবে এত উপাদান একসঙ্গে হলে প্রায়ই আরোপিত মনে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু এ ক্ষেত্রে দারুণভাবে উতরে গেছেন সোহেল। সেই কারণেই তাঁর ছবির গল্প ও বর্ণনাও অনেক সাবলীল।

৭১টি শিল্পকর্ম নিয়ে শিল্পাঙ্গ গ্যালারিতে ১ এপ্রিল শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি চলবে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত।

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 43 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*