Home » অন্যান্য » শিল্প ও সাহিত্য » অনুভূতির তরঙ্গ

অনুভূতির তরঙ্গ

একটা শোবার ঘর। বিছানা পরিপাটি। নরম আলো জ্বলছে এক কোনায়। ঘরের বাসিন্দা হয়তো আশপাশেই আছেন। নয়তো লাগোয়া স্নানঘরে। এই আপাত সাধারণ আয়োজন, চেনা আসবাবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শিল্পের ছায়া। সাজানো শোবার ঘর ওটা আসলে চলচ্চিত্রের সাজানো সেট অথবা বলতে পারেন মঞ্চ। শিল্পী আদতে চলচ্চিত্রের শোবার ঘরের একটি সেটকেই হাজির করেছেন শিল্পকর্মের আদলে।
এই আপাত ম্যাড়ম্যাড়ে কিন্তু ঘোর লাগানো শয়নকক্ষ ছেড়ে হাঁটি অন্য পথে। থমকে দাঁড়াই এক আশ্চর্য স্তম্ভের সামনে। যে স্তম্ভ লতার মতো ঝুলছে ছাদ থেকে। স্তম্ভের শরীরটা খেয়াল করি। রান্নাঘরের যাবতীয় সরঞ্জাম তার শরীরজুড়ে। পাতিল, খুন্তি, কড়াই, কী নেই সেখানে।
ফ্রিজ আর্ট ফেয়ার, লন্ডন শিল্পের দুনিয়ায় বড়সড় এক নাম। ৬-৯ অক্টোবর লন্ডনে রিজেন্টস পার্কে এই আয়োজন এক করেছিল সারা বিশ্বের ১৬০টি প্রথম সারির গ্যালারি আর হাজারের বেশি নামজাদা শিল্পীর কাজ। অভিনব শিল্পকর্ম, রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি আর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এবারের ‘ফ্রিজ লন্ডন’ ছাড়িয়ে গেছে আগের আসরগুলোকেও।

‘ফ্রিজ আর্ট’ আর ‘ফ্রিজ মাস্টার্স’ নামে দুটো বড় শাখা
প্রথমটায় সমকালীন শিল্পীদের কাজ। অন্যটা বলা যেতে পারে গুরুস্থানীয় আর কালজয়ীদের আয়োজন। সঙ্গে দিনভর দুঁদে শিল্পী-সমালোচকদের অংশগ্রহণে জমজমাট আলাপচারিতা। (সেগুলো এমনই ভরপুর যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্তত দুদিন আগে অনলাইনে বুকিং ছাড়া প্রবেশ অসম্ভব। শিল্পকর্ম সংগ্রহের বর্তমান হালচাল বা সাম্প্রতিক প্রবণতা-গোছের একটা আলোচনা অনুষ্ঠানে নাম লেখাতে গিয়ে সেটা বুঝেছি হাতেনাতে।) এবারের ফ্রিজ আর্ট ফেয়ার, লন্ডনের আলোচিত কিছু দিক আর কাজের কথা বলা যাক।
রেড স্টেইভ
সামনের অংশ ঝকমকে লালচে আর পেছনটা রুপালি। দুদিকেই আছে আশ্চর্য প্রতিবিম্বের খেলা। অনিশ কাপুরের এই ইস্পাতের স্থাপনা তার ঝাঁ চকচকে রূপ, উচ্চতা আর প্রতিবিম্বের বৈচিত্র্য সবকিছু দিয়েই বিমোহিত করে দর্শককে। খ্যাতিমান এই শিল্পী পুরো ১৮ মাস সময় নিয়েছেন রেড স্টেইভ বা লাল খোল শিরোনামের এই শিল্পকর্ম তৈরি করতে। দামটাও মনে রাখার মতো, সাড়ে তিন মিলিয়ন পাউন্ড!

‘সিংগিং সানস’ ও ‘স্পিচ বাবলস’

ফিলিপ পেরেনো এবং সাজিয়া সিকান্দারের দুটো ভিন্ন ঘরানার কাজের সম্মিলন। সাজিয়া খন্দকারের ‘সিংগিং সানস’ বা গাইয়ে সূর্য আদতে একধরনের অ্যানিমেশন। যেখানে পাশাপাশি অনেক সূর্য আলো বিচ্ছুরণ করে আবার কণা হয়ে ভেঙে পড়ে।

আর ছাদজুড়ে সাজানো ফিলিপ পেরেনোর কথার বেলুনগুলো হাজির হয় বহু না-বলা অথবা কাল্পনিক হাজারো কথার রূপ নিয়ে। বাংলাদেশের শিল্পবোদ্ধাদের জানিয়ে রাখা যেতে পারে, এই শিল্পকর্মটি অচিরেই যুক্ত হতে চলেছে বাংলাদেশের সামদানী আর্ট ফাউন্ডেশনের সংগ্রহে।

ব্রেকজিট দুর্ভাবনা

ব্রিটেনজুড়ে যখন ব্রেকজিট নিয়ে আলোচনা, কানাঘুষো, সেখানে সমকালীন শিল্পের বড় আসরে এই বিচ্ছেদ-ভাবনা মাথাচাড়া দেবে না তাই কি হয়? সাদার মাঝখানে লাল হরফে কাল্পনিক সব সংবাদ শিরোনামের ঢংয়ে শিল্পী মাইকেল লেন্ডি হাজির করেছেন ইউরোপের মানুষের ব্রেক্সিট-বিষয়ক বিবিধ অনুভূতি। দর্শকদের নজর কাড়বে, এটাই তো স্বাভাবিক।

ভাস্কর্য উদ্যান

ফ্রিজ আর্ট ফেয়ারের ভাস্কর্য উদ্যান কোনো চার কোনা ঘরের মধ্যে বন্দী নয়। রিজেন্টস পার্কজুড়ে ছড়ানো সবগুলো ভাস্কর্য। কনার্ড শক্রস, ক্লস ওডেনবার্গ, নাইরি বাগরামিয়ান, অ্যাড হ্যারিংয়ের মতো ১৯ জন নামি ভাস্করের কাজ আছে এই ভাস্কর্য উদ্যানে। এখানে টিকিট কেনার ঝক্কি নেই। সবার জন্য এই উদ্যান উন্মুক্ত।

শিল্পী হেনরি ক্রকাটিজের ‘কেবিন ২০১৬’ নামের ভাস্কর্য ছিল আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। এটি আসলে একটি কুঠুরি। এই আশ্চর্য কুঠুরিতে ঢোকেন কৌতূহলী দর্শকেরা। তারপর সেটি ঘুরিয়ে দেওয়া হয় ১৮০ ডিগ্রি। কুঠুরির ঘূর্ণিপাক থেকে বের হওয়ার পরই বিচিত্র উল্লাসধ্বনি করতে থাকেন দর্শকেরা। ব্যাপারটা একটু নিজে তলিয়ে না দেখলে নয়! এই বিচিত্র অনুভূতি পরখ করে দেখার জন্য ভিড়ে গেলাম অপেক্ষমাণ দর্শক সারিতে। তারপর এল সেই অন্ধকার কুঠুরিতে ঢোকার মাহেন্দ্রক্ষণ। কুঠুরি ঘুরল। কোনদিকে জানি না। বেরিয়ে আসার পর মুহূর্ত খানেকের জন্য নিজেকে মনে হলো দিকশূন্যপুরের বাসিন্দা। ‘কেবিন’ নামের ভাস্কর্য বা আশ্চর্য কুঠুরিটি এবারের ফ্রিজ আর্টের অন্যতম আকর্ষণ।

বড়সড় একটা হাড় পড়ে আছে ঘাসের ওপর। এই হাড় যেন আচমকা প্রাগৈতহাসিক যুগে টেনে নিয়ে যায় দর্শককে। এই হাড়-রহস্য উদ্ঘটনের আগেই আপনার সামনে দেখুন সিরামিকের বাঁকানো সুদীর্ঘ গাছের ডাল অথবা দু-পেয়ে সেই আশ্চর্য বাঁধাকপিসৃদশ স্থাপনা। সব মিলিয়ে যেকোনো চিন্তাশীল দর্শকের ভাবনার দুনিয়ায় বড় ধরনের নাড়া দেয় এই ভাস্কর্য উদ্যান।

ফ্রিজ আর্ট ফেয়ার ফুরোলেও ভাস্কর্য উদ্যান চালু থাকবে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস অবধি।

ফ্রিজ মাস্টার্স

মেয়েদের কারও হাতে পিচকারি। কারও হাতে ফুল। কেউ-বা বাজাচ্ছে বাদ্যযন্ত্র। উৎসবের সাজে সেজেছে সবাই। বিলাসবহুল তাঁবুর নিচে তারা খেলছে রং ছোড়াছুড়ির খেলা। মোগল আমলের ভারতীয় উপমহাদেশের এই ছবির শিল্পী প্রহ্লাদ বব্বর। অমূল্য এই চিত্রকর্ম ‘ফ্রিজ মাস্টার্স’ বিভাগে স্থান পাওয়া হাজারো রত্নের একটি মাত্র। আমাদের উপমহাদেশীয়দের কাছে এই চিত্রকর্ম দ্রষ্টব্য হয়ে উঠতে পারে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণেই।

প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে বিংশ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত মূলত গুরুস্থানীয় শিল্পীদের কাজ ছিল ফ্রিজ মাস্টার্সে। প্যারিস, মিলান, মাদ্রিদ, মিউনিখ থেকে সান ফ্রান্সিসকো কিংবা বেইজিং। বিশ্বের সামনের সারির ১৩০টি গ্যালারি তাদের মহা মূল্যবান সংগ্রহের জৌলুশ নিয়ে উপস্থিত ছিল ‘ফ্রিজ মাস্টার্স’ বিভাগে।

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 64 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*