Home » অপরাধ » বরিশালে স্কুল থেকে ডেকে নিয়ে ছাত্র খুন

বরিশালে স্কুল থেকে ডেকে নিয়ে ছাত্র খুন

বরিশাল নগরের একটি বিদ্যালয়ের ছাত্র সাইয়েদুর রহমান হৃদয় গতকাল শনিবার সকালে দাঁড়িয়ে ছিল স্কুলের মাঠে। কথা আছে বলে সেখান থেকে তাকে ডেকে নেয় কয়েকজন তরুণ। একটু দূরে নিয়ে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয় তাকে। এ দৃশ্য দেখে এগিয়ে যায় তার সহপাঠী গোলাম সাজিদ রাফি। ছুরিকাঘাত করা হয় তাকেও।

দুজনকে উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলে নিয়ে গেলে হৃদয়কে (১৫) মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। রাফি চিকিৎসাধীন আছে হাসপাতালে। সে শঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

হৃদয় ও রাফি দুজনই মহানগরীর শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। নিহত হৃদয়ের বাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায়। এ ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে।

হৃদয়ের সহপাঠী, শিক্ষক ও কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, আরেক শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় হৃদয়ের সঙ্গে সম্প্রতি কয়েকজন বখাটের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এর জের ধরেই এই খুনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে তাঁরা সন্দেহ করছেন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি কিশোর অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। বরিশাল মহানগরেও গত ছয় মাসে এ ধরনের প্রায় ১৫টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কিন্তু খুনের ঘটনা এটাই প্রথম।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাফি জানায়, সকাল পৌনে ১০টার দিকে হৃদয় বিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় কয়েকজন তরুণ হৃদয়কে কথা আছে বলে বিদ্যালয়ের কাছেই পরেশ সাগর মাঠ এলাকায় নিয়ে যান। পরে তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে থাকেন। তার চিৎকারে রাফি সেখানে গিয়ে হামলাকারীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকেও কুপিয়ে জখম করেন তাঁরা। হৃদয় ততক্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। খবর পেয়ে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এসে তাদের উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেলে ভর্তি করে। পরে হৃদয় মারা যায়।

তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক খালেদুর রহমান বলেন, হৃদয়কে হাসপাতালে আনার আগেই সে মারা যায়। তার কিডনি, ফুসফুসেও ছুরির আঘাত লেগেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। আহত অন্য শিক্ষার্থীর চিকিৎসা চলছে। তার পিঠে ছুরির আঘাত লেগেছে। সে শঙ্কামুক্ত আছে।

ছেলে সাইয়েদুর রহমান হৃদয়কে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। হঠাৎ ছেলেকে এভাবে হারিয়ে বাবার আহাজারি। গতকাল বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা ছবি l সাইয়ানহৃদয়ের বাবা মো. জিয়াউর রহমান ছেলে হত্যার খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে যান। বিলাপ করতে করতে একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে নানা মো. হারুন অর রশীদ বলেন, কয়েক বছর আগে হৃদয়ের মা মারা গেছেন। একমাত্র সন্তান হৃদয় লেখাপড়ায় খুব ভালো। নিজ এলাকা পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় ভালো বিদ্যালয় না থাকায় বরিশালে পাঠানো হয় হৃদয়কে। সেখানে একটি কোচিং সেন্টারে আবাসিক ছাত্র হিসেবে থেকে সে লেখাপড়া করত।

আহত রাফি বলেছে, কিছুদিন আগে ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় হৃদয়ের সঙ্গে বেশ কিছু বখাটের দ্বন্দ্ব হয়। এরই জেরে তার ওপর হামলা হয়েছে বলে তার ধারণা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পাপিয়া জেসমিনও বলেন, ‘শুনেছি কয়েক দিন আগে এক শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করেছিল হৃদয়। তবে বিষয়টি সে আমাদের জানায়নি। প্রতিবাদ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে বখাটেরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে।’

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান বলেন, ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় হৃদয় খুনের শিকার হয়েছে বলে তাঁদেরও ধারণা। পুলিশ হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে কাজ শুরু করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য হৃদয়ের লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার বাবা একটি হত্যা মামলা করেছেন।

ওসি বলেন, হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মো. সাইদুল ইসলাম (১৮) ও মো. সায়েম (২৫) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুজনই নগরের একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। গ্রেপ্তার সাইদুল জিয়া সড়কের বাসিন্দা এবং সায়েম কালুশাহ সড়কের বাসিন্দা।

গ্রেপ্তার দুজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানান গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. ফরহাদ সরদার। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার দুজন জানিয়েছেন, ইভ টিজিংয়ে বাধা দেওয়া ছাড়াও অন্যান্য ঘটনায় আগে হৃদয়ের সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। এর জের ধরেই হৃদয়কে তাঁরা হত্যা করেছেন বলে ধারণা করছেন তিনি। হত্যায় আরও কয়েকজন জড়িত আছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশালের সাবেক সভাপতি শিক্ষাবিদ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, সামাজিক অবক্ষয়, অস্থিরতা ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় না থাকায় এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। বর্তমানে কিশোরদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নেই বললেই চলে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তারা তেমন সংশ্লিষ্ট হতে পারছে না। কিশোরদের এ ধরনের অপরাধে জড়ানো ভয়ংকর অশনিসংকেত।

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 53 - Today Page Visits: 2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*