Home » আন্তজাতিক » মেক্সিকো সীমান্তে ট্রাম্পের দেয়াল কতটা বাস্তবসম্মত?

মেক্সিকো সীমান্তে ট্রাম্পের দেয়াল কতটা বাস্তবসম্মত?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারের সময়ই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি নির্বাচিত হলে দেশের দক্ষিণাংশের সীমান্তকে সুরক্ষিত করবেন। দেয়াল নির্মাণ করবেন মেক্সিকো সীমান্তে। যেমন কথা তেমন কাজ। ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহের মাথায় তিনি এ-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে সই করেন। কিন্তু এখন কথা হলো, এই দেয়াল কতটা বাস্তবসম্মত?

ট্রাম্প চান এই দেয়াল হবে ‘দুর্ভেদ্য, দৃশ্যমান, উঁচু, শক্তিশালী, সুন্দর, দক্ষিণ সীমান্তপ্রাচীর’। কিন্তু কতটা উঁচু, কতটা লম্বা, কতটা শক্তিশালী, কতটা সুন্দর?

অথচ গত নভেম্বরেও তিনি কিছুটা নমনীয় হয়েছিলেন। সিবিএসকে বলেছিলেন, শুধু ‘নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়’ বেড়া দিয়ে সীমান্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। কিন্তু জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরই সুর পাল্টান। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তা শুধরে দেন। বলেন, ‘বেড়া নয়, এটি হবে দেয়াল। আপনি ভুল বুঝেছেন।’
সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বেড়া। দেওয়া হবে দেয়াল। ছবিটি গত ২৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের সুনল্যান্ড পার্ক থেকে তোলা। এই জায়গা মেক্সিকান সীমান্তের সিউদাদ জুয়ারেজের শহরের বিপরীতে অবস্থিত। ফাইল ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যকার এ সীমান্ত প্রায় ১ হাজার ৯০০ মাইল। যার মধ্যে অনেক এলাকা খালি, ধুলোময় মরুভূমি, ঘন সবুজ ঝোপঝাড়, রিও গ্রেনেড নদীকে ঘিরে উঁচুনিচু পথ। তবে দীর্ঘ এই সীমান্তের মধ্যে এখন প্রায় ৬৫০ মাইল জায়গায় ছাড়া ছাড়া অবস্থায় বেড়া দেওয়া আছে। কোথাও কোথাও আবার কংক্রিটের স্ল্যাব ও অন্যান্য অবকাঠামো দিয়ে ঘেরা। ট্রাম্প বলেছেন, এক হাজার মাইলজুড়ে হবে এ দেয়াল। আর বাকিটা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে নিরাপদ থাকবে।

নিউইয়র্কভিত্তিক স্ট্রাকচারাল প্রকৌশলী আলী এফ রুজখান ন্যাশনাল মেমো নামের একটি আর্টিকেলে লিখেছেন, দেয়াল হিসেবে অবশ্যই কংক্রিট বেশি জুতসই। ট্রাম্পের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ হাজার ৯০০ মাইল দেয়াল করতে হলে প্রায় ৩৩৯ মিলিয়ন কিউবিক ফুট কংক্রিট লাগবে, যা হোভার বাঁধ তৈরির সময় লাগা কংক্রিটের তিন গুণ।

রুজখান এই হিসাব করেছেন দেয়ালটিকে মাটির নিচে ৫ ফুট আর ওপরে ২০ ফুট হিসাবে করে। কিন্তু ট্রাম্পের হিসাবে দেয়ালের উচ্চতা ৩০ ফুট থেকে ৫৫ ফুট হতে পারে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। আর এটি যদি হয়, তাহলে কংক্রিটের পরিমাণ আরও ব্যাপক হারে বাড়বে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে পরিবহন খরচ, নির্মাণকর্মীদের খরচসহ নানা ধরনের ব্যয়।

এই দীর্ঘ দেয়ালের খরচ হবে কত আর তা আসবে কোথা থেকে—এ হচ্ছে বিশাল প্রশ্ন। ট্রাম্প যদিও বলছেন, অল্প খরচেই তিনি বিশাল দেয়াল নির্মাণ করবেন, যা তাঁর আগে কেউ করতে পারেনি। তিনি দাবি করেন, এই দেয়াল তৈরিতে ব্যয় হবে ১০০০ কোটি (১০ বিলিয়ন) থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার। কিন্তু এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা মনে করছেন, এই খরচ ট্রাম্পের হিসাবকে কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যাবে। কেননা, মেক্সিকোর সঙ্গে ৬৫০ মাইলজুড়ে থাকা দুর্বল বেড়ার সীমান্ত নির্মাণেই খরচ হয়েছে ৭০০ কোটি ডলারের বেশি।ক্যালিফোর্নিয়ার সান ইসাইড্রোতে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর তিজুআনা সীমান্তকে বিভক্ত করে এই বেড়া দেওয়া হয়। ছবিটি গত বুধবার তোলা। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেয়াল করতে গেলে তা প্রত্যন্ত, দুর্গম, এমনকি পাহাড়ি এলাকার ওপর দিয়েও যাবে। ফলে খরচ বাড়বে। এ ছাড়া এই ১০০০ মাইলের মধ্যে অনেকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও রয়েছে। ফলে এগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কিনতে হবে অথবা মালিকের কাছ থেকে আর্থিক বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে নিতে হবে। ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেয়াল করতে গেলে খরচ গিয়ে পৌঁছাবে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে।

ট্রাম্প শুরু থেকেই এই দেয়ালের নির্মাণের খরচ মেক্সিকোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বারবার বলছেন মেক্সিকোকে এই খরচ দিতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নেইতো স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের কোনো খরচ দেবেন না।

তাহলে মেক্সিকোকে কীভাবে বাধ্য করবেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, মেক্সিকো থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বাড়িতে অর্থ পাঠানোর সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে খেসারত দিতে বাধ্য করা হবে। আর এটি করা হবে ইউএস প্যাট্রিয়ট অ্যাক্টের বিধান অনুযায়ী। এই আইন সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগান বন্ধ করতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ট্রাম্প কি সত্যি এ আইনের ব্যবহার করতে পারবেন—এমন প্রশ্ন উঠলে ট্রাম্প বলেন, না হলে তাঁর কাছে নানা ধরনের প্রস্তাবও আছে। যেমন ভিসা আবেদনের ফি বৃদ্ধি, সীমান্ত পারাপার কার্ডের চার্জ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য শুল্ক জোরদার করা।

ওয়াশিংটন পোস্ট তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, তাঁর এই পরিকল্পনা কি আদৌ বাস্তবসম্মত? জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি আপনি আলোচনার শিল্প জানেন, তাহলে তা অবশ্যই বাস্তবসম্মত আর আপনি যদি একগাদা ক্লাউন টাইপের আলোচনা করেন, তাহলে তা বাস্তববিরোধী।’

অথচ এরই মধ্যে নতুন কৌশল নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। ওয়াশিংটন বলেছে, এই খরচ তুলতে যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকোর পণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ হারে শুল্ক নেওয়া হবে। অবশ্য পরে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ রেইন্স প্রিবাস বলেন, শুধু ট্যাক্সের অর্থেই দেয়াল বানানো হবে তা নয়, এর খরচের অনেকগুলো উৎসের মধ্যে এটি একটি।

এরই মধ্যে মেক্সিকো সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের নিন্দা জানিয়েছে। বলেছে, এতে মার্কিন নাগরিকেরাই বিপদে পড়বে। কর আরোপের কারণে মেক্সিকোর পণ্য তাদের আগের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে। এ ছাড়া জার্মানির বার্লিনের মেয়র মুলার ট্রাম্পের প্রতি এই বিচ্ছিন্নতার পথে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্লিনের বুক চিড়ে তৈরি করা দেয়ালের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এই বিভক্তি দাসত্ব ও যন্ত্রণার জন্ম দেয়। ধ্বংস করে দেয় লাখো মানুষের জীবন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মনে এখন প্রশ্ন, সীমান্তে দেয়াল তৈরির মাধ্যমে সত্যি নিরাপত্তা বাড়বে, নাকি প্রতিবেশীকে দূরে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়বে?যুক্তরাষ্ট্রের সুনল্যান্ড পার্ক এলাকায় মেক্সিকান সীমান্তে নতুন নির্মিত দেয়াল। এই জায়গা মেক্সিকান সীমান্তের সিউদাদ জুয়ারেজ শহরের বিপরীতে অবস্থিত। ছবিটি গত ৯ নভেম্বর তোলা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

এই দেয়াল শুধু যে দুই দেশের মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করবে তা নয়, দূরত্ব তৈরি হবে প্রাণিজগতে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত অঞ্চল পশুপাখির জন্য এক অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। অনেক প্রাণী প্রতিনিয়ত স্বজাতির সঙ্গে দেখা করতে এ দেশ-ও দেশ করে। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকার বিপন্ন জাগুয়ার, কালো ভালুকও রয়েছে। তাদের এই বিচরণ থেকে গেলেও হয়তো পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে এই প্রাণীগুলো।

প্রাণিকুলের ওপর প্রভাব ছাড়াও এই দেয়াল দুই দেশের মধ্যে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হবে। যেমনটা হবে বিশাল বালু এলাকার ক্ষেত্রেও। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে চলা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তা নির্মাণ এবং প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতার এই কংক্রিটের বিশাল দেয়াল প্রাকৃতিক ভূচিত্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। অথচ ট্রাম্প বলছেন, এই দেয়াল হবে ‘খুব সুন্দর’। (বিবিসি অবলম্বনে লিপি রানী সাহা)

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 43 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*