Home » রাজনীতি » ১৬ বছরেও অসম্পন্ন মামলার বিচারকাজ

১৬ বছরেও অসম্পন্ন মামলার বিচারকাজ

ঢাকা: ১৬ বছর পার হয়ে গেলেও ২০০১ সালে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনার মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। ২০০১ সালের এই দিনে রাজধানীর পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা হয়। ১৬ বছর পার হলেও এই মামলার বিচারকাজে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

একাধিক তদন্তেই পার হয়েছে এক যুগের বেশি সময়। এ ছাড়া সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলার বিচারকাজ শেষ করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সুবিচার পাবেন কি না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন সিপিবির নেতারা। তবে অতি শিগগিরই এই মামলার বিচার শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

মামলাটি ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ এস এম জিয়াউর রহমানের আদালতে বিচারাধীন। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার মামলার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু জানান, দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার মামলাটির সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর সাক্ষী খুঁজে না পাওয়ায় তাদের ঠিকানায় পাঠানো সমন ফেরত আসছে। আমরা চাই আলোচিত মামলাটি খুব দ্রুত শেষ হোক। অল্প সময়ের মধ্যে সাক্ষী ক্লোজ করে মামলাটি শেষ করার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আসাদুজ্জামান খান (রচি) বলেন, ‘আলোচিত এ মামলার বিচার কাজ দ্রুত শেষ করতে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। ঘটনার দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া দূরহ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। তবে আদালতে সাক্ষী আনার জন্য সাক্ষীদের প্রতি সমন ও জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও পাঠানো হয়। এরপরও অনেক সাক্ষী আদালতে আসছেন না।

এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষী হাজির করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। মূলত তাদের ব্যর্থতার কারণেই এ মামলার বিচার কাজ বিলম্ব হচ্ছে। কয়েকজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। তবে অধিকাংশ সাক্ষীরই সাক্ষ্য বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, এ মামলায় অনেকেই সাজানো সাক্ষী। কারণ, ঘটনার সময় আহত ও চিকিৎসা নেওয়া যেসব সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের কেউ এর স্বপক্ষে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেখাতে পারেননি। এগুলো দলীয় সাক্ষী, দলীয়ভাবে এসব করা হয়েছে।’

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচজন নিহত হন, এবং ২০ জন আহত হন। ওই ঘটনায় দলের তৎকালীন সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বাদী হয়ে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত শেষে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় এ মামলায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়। এরপর ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা ও ২০০৫ সালের আগস্টে দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা হয়। এসব ঘটনায় জঙ্গিরা জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়ার পর আবার এই মামলার তদন্ত শুরু হয়।

সাত কর্মকর্তার হাত ঘুরে এ তদন্তভার পান পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মৃণাল কান্তি সাহা। তিনি তদন্তকালে আসামি মুফতি মাঈনুদ্দিন শেখকে গ্রেপ্তার করেন। মাঈনুদ্দিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে এ ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদ (হুজি) জড়িত বলে জানায়।

অন্যদিকে আসামি মুফতি আবদুল হান্নান ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে জানান, সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় তার দল হুজি জড়িত। দীর্ঘ পুনঃতদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর ১৩ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর হত্যা মামলায় ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট ও বিস্ফোরক মামলায় ওই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। মামলা দুইটির মধ্যে হত্যা মামলায় ২৮ জন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ৩০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। সাক্ষীদের মধ্যে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স সাক্ষ্য দিয়েছেন।

সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘সমাবেশে বোমা হামলার বিচার এখনো পর্যন্ত না পাওয়া খুবই দুঃখজনক। এক সময় আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে এ মামলা বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে আমাদের আন্দোলনের মুখে মামলা চালাতে বাধ্য করা হয়। তবে গাফিলতির কারণে মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যাচ্ছে। মামলার অগ্রগতি প্রসিকিউটরদের তৎপরতার ওপর নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে আমরা বিচারের স্বপক্ষে জনমত আরো তীব্র করতে পারি। তবে চূড়ান্ত কাজটা তাদেরই করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিজ স্বার্থে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। আর তার ফলেই আজ এ মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা।’

বামপন্থীদের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে এ দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান জানিয়ে তিনি বলেন, ওই সময় আমরা বলেছিলাম, এ হামলার বিচার করতে না পারলে জঙ্গিরা এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটাতে থাকবে। আর আমাদের আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। প্রথমে যশোরে উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে, এরপর রাজধানীর পল্টনে আমাদের (সিপিবি) সমাবেশে, এরপর রমনা বটমূলে বর্ষবরণে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে, পরবর্তী সময়ে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে এবং তারপর থেকে এখন পর্যন্ত জঙ্গি হামলার ঘটনা অব্যাহত।

সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলায় খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সিপিবি নেতা হিমাংশু মণ্ডল, খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সিপিবি নেতা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা আব্দুল মজিদ, ঢাকার ডেমরা থানার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক নেতা আবুল হাসেম ও মাদারীপুরের মুক্তার হোসেন, খুলনা বিএল কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিপ্রদাস মারা যান।

ওই মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন-জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, মুফতি মাঈনুদ্দিন শেখ, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, শওকত ওসমান, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা মশিউর রহমান, আবদুল হাই, শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, নুরুল ইসলাম, মহিবুল মুস্তাকিম, আনিসুল মুরসালিন ও রফিকুল ইসলাম। আসামিদের মধ্যে প্রথম পাঁচজন কারাগারে ও পরের সাতজন পলাতক।

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 35 - Today Page Visits: 1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*