Home » সম্পাদকীয় » খোলা কলাম » বাংলা-বাঙ্গালীর সামাজিক মুক্তি ও শেরে-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক

বাংলা-বাঙ্গালীর সামাজিক মুক্তি ও শেরে-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক

সম্পাদকীয় :

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার একাধিক বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী নেতা সামনের কাতারে চলে আসেন। পর্যায়ক্রমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় দলের মূল নেতৃত্ব আসীন হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মাস্টারদা সূর্য সেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ২০০৪ সালের বিবিসি বাংলার ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ জরিপে চতুর্থ স্থানে রয়েছেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক।

দেখা যায় ফজলুল হকের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার জন্য খ্যাতি ছিল ঘরে-বাইরে। বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সর্বভারতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ফজলুল হক। তার আপসহীন নীতি ও অসামান্য বাগ্মিতার কারণে সকলস্তরে পরিচিত ছিলেন শেরে বাংলা (বাংলার বাঘ) নামে। জনশ্রুতি ও গবেষণায় উঠে এসেছে সর্বভারতীয় রাজনীতির পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তিনি নিজের জীবন নিবেদন করেন। তৎকালীন প্রকাশ্যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের জন্য তিনি সর্বপ্রথম অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

প্রসঙ্গত আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতি বুঝিনে। ওসব দিয়ে আমি ফজলুল হককে বিচার করিনে। আমি তাঁকে বিচার করি গোটা দেশ ও জাতির স্বার্থ দিয়ে। একমাত্র ফজলুল হকই বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে বাঁচাতে পারে। সে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সাচ্চা মুসলমান। খাঁটি বাঙালিত্ব ও সাচ্চা মুসলমানিত্বের এমন সমন্বয় আমি আর দেখিনি।’

বরিশালের মধ্যবিত্ত পরিবারে ফজলুল হকের জন্ম। ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের প্রতিভাবান ছাত্র। কিন্তু, প্রথমে এমএ ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায়। পরীক্ষার মাত্র ছয় মাস আগে তাকে এক বন্ধু ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন যে, মুসলমান ছাত্ররা অঙ্ক নিয়ে পড়ে না, কারণ তারা মেধাবী নয়। এই কথা শুনে ফজলুল হকের প্রবল জেদ হয়। তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, অঙ্কশাস্ত্রেই পরীক্ষা দেবেন। এরপর, মাত্র ছয় মাস অঙ্ক পড়েই শেরে বাংলা প্রথম শ্রেণিতেই উত্তীর্ণ হন।

তারপর কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বিএল পাশ করে স্যার আশুতোষ মুখার্জির শিক্ষানবিশ হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন। দুই বছর কাজ করার পর ১৯০০ সালে তিনি সরাসরি আইন ব্যবসা শুরু করেন। হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করলে খুব তাড়াতাড়ি চারদিকে নাম ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে তার কথাবলার ধরনটা একটু অন্য রকম। বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে প্রচুর দেশীয় শব্দ ব্যবহার করে, আন্তরিকতা নিয়ে, সঙ্গে শ্লেষ জুড়ে এমন করে জমিয়ে দিতেন, যে সাধারণ মানুষ তো হতোই— বিচারপতিরা পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন।

আইন-পেশা ও ভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলার মানুষের সামাজিক মুক্তির কথাও ভেবেছেন তিনি। অনুভব করেন, সেমিনার বক্তৃতায় আগুন ঢেলে দিলে সাধারণ মানুষের শোষণ থেকে মুক্তি হবে না। কাজ করতে হবে। প্রান্তিক মানুষের জীবন কাছ থেকে দেখা ও নিজে মধ্য ঘরানার জমিদার হওয়ায় নিঃস্ব গরিব চাষিদের মর্মযাতনা অনুভব করতে পারতেন। অন্যদিকে তাকে উদ্দীপ্ত করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে অমানবিক আচরণ! দেখা যেত কৃষকশ্রেণি তাদের অত্যাচারে পিষ্ট, জমিদার সম্প্রদায়ের সরকারকে দেয় রাজস্ব, হাস্যকর নিচু জায়গায় বাঁধা, অথচ যে কৃষকশ্রেণি হাল টেনে বীজ বোনে, দিনরাত খাটুনি যায়, দিনরাত পরিশ্রমে ফসল ফলায়, তার ওপর জমিদারদের খাজনা অহেতুক বেড়েই চলে। আর খাজনা দিতে না পারলে জমি থেকে উৎখাত।

এইভাবে কারণে-অকারণে আতঙ্কে কৃষকরা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়, ঋণের বোঝা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। অপরিশোধনীয় ঋণের পাহাড়, দরিদ্র কৃষকদের অনাহারে-অপুষ্টিতে দিনাতিপাত। সর্বোপরি কৃষিভিত্তিক বাংলার প্রাণ ছিল রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলানো কৃষকেরা। কিন্তু, তাদেরকে প্রতিনিয়ত শোষণ করে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে একদল জমিদার আর মহাজন। তৎকালে এমন দৃশ্য চোখের পড়ার মতো। এ হতে পারেনা।

তাই— ‘অনুকম্পায়ী ফজলুল হক বুঝেছিলেন, যদিও কৃষককুলের অধিকাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত এবং জমিদারদের অধিকাংশ উচ্চবর্গীয় হিন্দু, সমস্যাটি সম্প্রদায়-ভিত্তিক নয়, শ্রেণিগত। সংগঠিত কৃষক আন্দোলন তখনও আঁতুড়ঘরে। ফজলুল হক ও তাঁর কৃষক প্রজা পার্টি কৃষকদের রক্ষাকর্তা রূপে কিছু কিছু সংস্কার সাধনে বদ্ধপরিকর। মুসলিম লিগে দু’এক জন বিত্তবান মুসলমান জমিদার ছিলেন, তাঁরা কোনও বাধা সৃষ্টি করলেন না। ফজলুল হক আইন করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে খাজনার হারে রাশ টানলেন। এখানেই থামলেন না, আমূল ভূমি সংস্কারের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করলেন। সেই সঙ্গে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রদেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী শতকরা চুয়ান্নটি পদ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দিলেন। উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্তদের মধ্যে হাহাকার শুরু হল। তখনও বামপন্থী চিন্তার প্রসার ঘটেনি, কংগ্রেস নেতৃত্ব ভূস্বামীসংকুল। শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তদের মধ্যেও সরকারি কাজে যোগ দেওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ায় বিক্ষোভ-উত্তেজনা, কংগ্রেস রাতারাতি উগ্র ফজলুল হক-বিরোধী হয়ে উঠল। তাঁকে ঘোর সাম্প্রদায়িক হিসেবে বর্ণনা করে জনসভায় বক্তৃতার পর বক্তৃতা, হিন্দু মালিকানায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকায় দিনের পর দিন আক্রমণ। তিতিবিরক্ত হয়ে তিনি কৃষক প্রজা পার্টির পাট গুটিয়ে সদলবলে মুসলিম লিগে যোগ দিলেন, প্রাদেশিক সরকার পুরোপুরি মুসলিম লিগ সরকারে পরিণত হল। পরবর্তী যে সব ঘটনাবলি, তার ফলেই মুসলিম লিগের অভাবনীয় প্রভাব বিস্তার এবং ইতিহাস থেকে এখন ফজলুল হকের নাম বিলুপ্ত। কিন্তু তাঁরই উদ্যোগে গৃহীত সংস্কারগুলির পরিণামে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটি সচেতন মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমশ উদ্ভব, হক-কৃত সংস্কারাদিতে মুসলমানদের জীবিকা ও শিক্ষার সুযোগ বহুগুণ বাড়ল, গরিব কৃষক ঘরের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে শুরু করল’— প্রাবন্ধিক অশোক মিত্র।

শেরে বাংলার জীবন ও কীর্তি ইতিহাসের দালিলিক উপকরণ। প্রাসঙ্গিক একটি মন্তব্য প্রাবন্ধিক গৌতম রায়ের লেখা থেকে সাহায্য নিলাম: মুসলমান মানেই মুসলীম লীগ নয়। আর মুসলীম লীগ মানেই সাম্প্রদায়িক নয়, মৌলবাদী নয়। দেশভাগের উগ্র সমর্থক নয়, হিন্দু বিদ্বেষী নয়।

অন্যথায় লেখক আরও বলেন, মুসলমান সমাজের ওপর হিন্দু সমাজের ধারাবাহিক আর্থিক ও সামাজিক শোষণ মুসলমান সমাজে নবজাগরণের ফলে একটা বড় অংশের ভিতরে ক্ষোভকে দানা বাঁধার মতো জায়গায় নিয়ে আসে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া অংশের মুসলমানদের ক্ষোভকে সম্বল করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মুসলমান সমাজের যে অংশ উঠে আসতে থাকে তাদের ভেতরে নানা রকমের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এর পাশাপাশি উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ব্রিটিশবিরোধী মানসিকতাকে সংহত করতে যে জাতীয়তার চেতনা বিকাশ লাভ করতে থাকে, প্রায় শুরু থেকেই তা বিকশিত হয় ‘হিন্দু জাতীয়তা’ রূপ ধরে। মুসলমান সমাজ ভারতের প্রথম জাতীয় সংগ্রামে (১৮৫৭) ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করলেও তিলক, বঙ্কিম, অরবিন্দের চেতনায় যে জাতীয়তাবাদ সমৃদ্ধ হয় সেই বোধে মুসলমানকে আপন করে নেওয়ার পরিবর্তে ঘৃণার মানসিকতা বৃদ্ধির দিকেই অনেক বেশি ঝোঁক দেখা যায়।

সেই প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ নিয়ে বাংলার জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়লে, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ উপলব্ধি করেন মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি সংগঠন দরকার। এই চিন্তা থেকেই ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স আহ্বান করেন। এই সম্মেলনে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ নিজে এবং যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন নবাব ভিকারুল মুলক এবং এ কে ফজলুল হক। সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকার আহসান মঞ্জিলে। এই কনফারেন্সে নবাব সলিমুল্লাহ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নামে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন ও সেই প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অবশেষে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের সূত্রপাত ঘটে।

এবার মুসলিম লীগের অন্যরকম একটা বিষয় তুলে আনি। ইতিহাসের আরেক অসামান্য ব্যক্তি সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বই থেকে। এখানে অজানা এক অধ্যায় উন্মোচন হয়। আবুল মনসুর আহমদ জানান, ‘দ্বন্দ্ব-কলহের মধ্যেও হক সাহেবের সহিত আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালই ছিল। পার্টির নেতাদের অনুরোধে একদিন আমি তাঁকে মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা-সমিতি উভয়টার সভাপতি থাকার মত স্ববিরোধী কাজ না করিয়া একটা হইতে পদত্যাগ করিতে অনুরোধ করিলাম। তিনি সুস্পষ্ট আন্তরিকতার সাথে জবাব দিলেন যে, মুসলিম বাংলাকে বাঁচাতে হইলে মুসলিম লীগও করিতে হইবে, কৃষক-প্রজা-সমিতিও চালাইতে হইবে। তাঁর এই সুস্পষ্ট অসংগত কথার সমর্থনে তিনি শক্তিশালী যুক্তিও দিলেন। তিনি বলিলেন: বাংলার ক্ষেত্রে প্রজা-আন্দোলন ও মুসলিম-আন্দোলন একই কথা। মুসলিম লীগ করা যেমন ভারতীয় মুসলমানের জন্য দরকার কৃষক-প্রজা-সমিতি করা তেমনি বাংগালী মুসলমানের জন্য দরকার। তিনি কৃষক-প্রজা-সমিতির সভাপতিত্ব ছাড়িয়া দিয়া এটাকে কংগ্রেস-নেতাদের হাতে তুলিয়া দিতে পারে না। তেমনি মুসলিম লীগের সভাপতিত্ব ছাড়িয়া দিয়া ওটাকে খাজা-গজাদের হাতে তুলিয়া দিতে পারেন না।’

এমনি সময় সমাজ পাঠে প্রজ্ঞাবান ছিলেন ফজলুল হক। বাংলার সামাজিক মুক্তির জন্য (যদিও সামাজিক মুক্তি চলমান প্রক্রিয়া) তার অবদান অসামান্য। আর কীর্তিমানদের প্রাসঙ্গিকতা থাকে কাল থেকে কালান্তর। এই বিষয়ে আরও জানতে চারদিক মানে আশেপাশের ঐতিহাসিকদের আঙিনায় চোখ রাখতে পারেন। তবে, ইতিহাস বলে শেরে বাংলা ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে যা শুরু করেছেন ১৯৭১ সালে এসে তা বঙ্গবন্ধু সমাপ্ত করেছেন স্বাধীনতার মাধ্যমে। ফলে বাংলাদেশের জনসাধারণকে রাষ্ট্রের সংকট সম্ভাবনা ও অভ্যুত্থানের পরম্পরা বুঝতে রাষ্ট্রনেতা সামাজিক মুক্তি নিয়ে সংগ্রাম ও উৎসর্গিত বিদগ্ধদের জীবন ও কীর্তি জানতে হবে। তন্মধ্যে এ কে ফজলুল হক,  মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল মনসুর আহমদ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

(কৃতজ্ঞতা: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, শেরে বাংলার জীবনী, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, বিবিসি বাংলা ও আনন্দবাজার)

লেখক : ফয়সাল রাকিব, সাংবাদিক।

পাঠকের মতামত...

Print Friendly, PDF & Email
Total Page Visits: 344 - Today Page Visits: 4

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*