
শিশুর চোখে পৃথিবীর প্রথম রূপটি আঁকেন মা। ভাষা, আচরণ, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধÑ সবকিছুর প্রাথমিক শিক্ষা সে পায় মায়ের কাছ থেকেই। একটি শিশু কীভাবে কথা বলবে, কীভাবে মানুষকে মূল্য দেবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কিংবা সত্যকে আঁকড়ে ধরবেÑ এসবের প্রথম পাঠ মায়ের কাছেই শুরু হয়। ফলে একটি সমাজ কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার মায়েরা কেমনভাবে গড়ে উঠছেন তার ওপর।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনও মায়ের ভূমিকা গৃহকোণেই সীমাবদ্ধ করে দেখার প্রবণতা রয়ে গেছে। মায়ের শ্রম, ত্যাগ ও অবদানকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়; তার শিক্ষা, মানসিক বিকাশ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। অথচ যে রাষ্ট্র মায়ের মর্যাদা ও সম্ভাবনাকে অবহেলা করে, সে রাষ্ট্র কখনই দীর্ঘমেয়াদে উন্নত ও মানবিক হতে পারে না। মায়ের সম্মান মানে শুধু আবেগী শ্রদ্ধা নয়; এর অর্থ বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করা। মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণÑ এই অধিকারগুলো নিশ্চিত না হলে মায়ের শক্তি পূর্ণতা পায় না। আর দুর্বল ও অবদমিত মায়ের হাতে গড়ে ওঠা প্রজন্ম কখনই সাহসী, নৈতিক ও দূরদর্শী জাতি নির্মাণে সক্ষম হয় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতিগুলো জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক উন্নয়নে এগিয়েছে, তারা নারীরÑ বিশেষত মায়ের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ শিক্ষিত মা কেবল নিজের জীবন বদলান না; তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করেন। তার সিদ্ধান্ত, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে পড়ে পরিবার পেরিয়ে সমাজে, সমাজ পেরিয়ে রাষ্ট্রে। শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে চাইলে তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মা। বাজেট, নীতি ও সামাজিক কাঠামোÑ সবখানেই মায়ের মর্যাদা ও বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ জাতির ভবিষ্যৎ কোনো স্লোগানে নয়, গড়ে ওঠে ঘরের ভেতরÑ মায়ের হাত ধরেই।
অবশেষে বলা যায়, একটি মানবিক রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত হলো মানবিক মানুষ তৈরি করা। আর সেই মানুষ তৈরির কারিগর মা। মাকে যদি আমরা জাতির স্থপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিই, সম্মান দিই এবং শক্তিশালী করে তুলিÑ তবেই জন্ম নেবে শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও আলোকিত একটি জাতি।
মেশকাতুন নাহার : প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ
কচুয়া, চাঁদপুর