
সমাজের দর্পণ। সত্য, তথ্য ও জনস্বার্থকে সামনে রেখে রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরা, মানুষের অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখা—এটাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার নামে অপতৎপরতারও বিস্তার ঘটছে। বিশেষ করে অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা এখন উদ্বেগের বিষয়।
এই বাস্তবতায় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেজগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়।
হাইকোর্টের এই নির্দেশনা নিছক একটি আইনি পদক্ষেপ নয়; এটি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বাংলাদেশে গণমাধ্যমের পরিসর যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের সুযোগও হয়েছে সহজলভ্য। একসময় সংবাদ প্রকাশের জন্য যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সম্পাদনার কঠোর প্রক্রিয়া প্রয়োজন ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারণে এখন প্রায় যে কেউ মুহূর্তের মধ্যে একটি তথ্য হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। এই সুযোগ গণতান্ত্রিক যোগাযোগকে সহজ করেছে; একই সঙ্গে দায়িত্বহীন ব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন সংবাদ ও মতামতের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রকাশ, ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদে রূপ দেওয়া, অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শিরোনাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন—এসব প্রবণতা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতি করে না; সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথাকথিত ‘মব সাংবাদিকতা’ বা দলবদ্ধভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রবণতা। কোনো ঘটনা বা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই যখন সামাজিক মাধ্যমে একতরফা প্রচার শুরু হয়, তখন ন্যায়বিচার ও ব্যক্তির মর্যাদা—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সব অনলাইন সংবাদমাধ্যম কিংবা সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংবাদ প্রচার অপসাংবাদিকতা নয়। অনলাইন সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দ্রুত মানুষের সামনে এসেছে। বহু পেশাদার সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংবাদমাধ্যম সীমিত সুযোগের মধ্যেও পেশাগত নীতি, তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রেখে কাজ করছেন। তাঁদের ভূমিকা প্রশংসনীয় এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সামাজিক হেনস্তা কিংবা মানহানিকর তথ্য প্রচারে যুক্ত হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইভাবে কোনো গণমাধ্যম যদি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই পরিচয়পত্র প্রদান করে বা সাংবাদিকতার পেশাগত মানদণ্ড উপেক্ষা করে, সেক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, সাংবাদিকতার পেশাগত মান ও নৈতিকতা সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং তথ্যের উৎস যাচাইয়ের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল বা অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে। চতুর্থত, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ করতে হবে।
তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—অপসাংবাদিকতা বন্ধ করতে গিয়ে যেন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত না হয়। সমালোচনামূলক সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনকে শুধু অস্বস্তিকর হওয়ার কারণে ‘গুজব’ বা ‘অপসাংবাদিকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার আড়ালে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য প্রচারের সুযোগও থাকা উচিত নয়।
প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক সংগঠন, সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও মালিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালনে আরও সক্রিয় হতে হবে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অনৈতিকতার অভিযোগ উঠলে ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক পক্ষপাতের পরিবর্তে প্রমাণ ও নীতিমালার ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশনা তাই সাংবাদিকতা বন্ধের বার্তা নয়; বরং দায়িত্বশীল ও আইনসম্মত তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন জরুরি, তেমনি সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সাংবাদিকতা তখনই তার মর্যাদা ধরে রাখতে পারে, যখন সেখানে সত্য অনুসন্ধানের সাহস, তথ্য যাচাইয়ের সততা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে।
হলুদ সাংবাদিকতা, গুজব ও ডিজিটাল হেনস্তা থেকে সমাজকে মুক্ত রাখতে তাই শুধু আইন প্রয়োগ নয়—সাংবাদিক, সম্পাদক, সংবাদমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক সংগঠন, প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। পেশাটির মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা এবং অনৈতিকতার বিরুদ্ধে নীতিনিষ্ঠ অবস্থান।