
বাংলাদেশি পণ্যে ট্রাম্প প্রশাসন যে বাড়তি ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তা কমবে বলে আশাবাদী বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেছেন, সোমবার দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হবে, যাতে ঠিক হবে ওই শুল্ক হার।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বশিরউদ্দীন। তিনি এ মন্ত্রণালয়েরও উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত বছর ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে।
পরে দর কষাকষি করে এ হার ২০ শতাংশ নামে, যা ১ অগাস্ট কার্যকর হয়। আর আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক; সব মিলিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক রয়েছে ৩৫ শতাংশ।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমরা আশা করছি যে ৯ তারিখে হতে যাওয়া চুক্তিতে আমরা চেষ্টা করছিলাম যে আরও কত কমানো যায় (শুল্ক)। কতটুকু কমবে এই মুহূর্তে আমি বলতে চাচ্ছি না বা পারছি না। আমরা আলোচনার ভিত্তিতে দেখব। শুধু যে আমরা ওভারঅল ট্যারিফ কমানোর চিন্তা করছি তা না; আমাদের প্রচেষ্টা রয়েছে যে— আমাদের যে মূল পণ্য গার্মেন্টস, সেই জায়গায় যেন আমাদের শুল্ক শূন্য হয়; আমরা সেই প্রচেষ্টায় এখনো রত রয়েছি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির শর্ত ফাঁস হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ৩৭ পারসেন্টের যে ট্যারিফ আমাদের উপরে ইম্পোজ হয়েছিল, যেটাকে আমরা নেগোশিয়েট করে ২০ পারসেন্টে নামিয়েছিলাম, যদি আমাদের এই চুক্তিটা প্রকাশিত না হতো আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, আমরা ২০ পারসেন্টের থেকেও কম পেতাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ওখানে বিব্রত হয়েছি; পৃথিবীতে একমাত্র দেশ—যেখান থেকে এই চুক্তির শর্তগুলি সারা দুনিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। তো তার পরেও আমরা আমাদের তাৎপর্যপূর্ণভাবে আমাদের প্রতিযোগী দেশসমূহ থেকে আমরা ২০ পারসেন্টে ট্যারিফ নামিয়ে এনেছি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং সংলাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু তাতে ট্রাম্পের মন গলেনি।
শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে—মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছে উড়োজাহাজ কেনা এবং গম, সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ।
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আমাদের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা নেই, ১৯টা প্লেন আমাদের আছে; ইনফ্যাক্ট আমাদের প্লেন আছে ১৪টা, বাকি প্লেনগুলো ফ্লাইঅ্যাবল না। এই ১৪টা প্লেন দিয়ে আমাদের যে নেটওয়ার্ক এবং আমাদের বিমানের যে মাস্টারপ্ল্যান; সেখানে আমরা বলছি ২০৩৫ সাল নাগাদ আমাদের ৪৭টা প্লেনের দরকার। আমার ধারণা আরও অনেক বেশি দরকার, বাট উনারা নিদেনপক্ষে ৪৭টা প্লেনের কথা বলেছেন। আমরা যে চুক্তি বোয়িংয়ের সাথে করতে যাচ্ছি, এটা ২০৩৫ সাল নাগাদ মাত্র ১৪টা প্লেন নিয়ে কথা বলছি।
বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, এই প্লেন ক্রয় প্রস্তাব বোয়িং এবং এয়ারবাসকে একসাথে বিশ্লেষণ করে টেকনো ইকোনমিক ফিজিবিলিটি করে একটা প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। এই প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এটার প্রাইস নেগোসিয়েশন করার জন্য ডক্টর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ (পরিকল্পনা উপদেষ্টা) স্যারকে হেড করে একটা নেগোসিয়েশন টিম করা হয় যেই টিম এই বোয়িংয়ের সাথে নেগোসিয়েট করছেন। এই নেগোসিয়েশন এখনো চলমান আছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আর ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির চাপে শেষ পর্যন্ত বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
গত ৩০ ডিসেম্বর বোয়িং থেকে ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার সিদ্ধান্ত দেয় বিমানের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে রয়েছে ৮টি সুপরিসর বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ও ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি ন্যারো বডির বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের উড়োজাহাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির প্রসঙ্গ টেনে শেখ বশির বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার মানে ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এই ৮০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ‘তুমি আমার কাছ থেকে যে পরিমাণ রপ্তানি করো, তার থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমার কাছ থেকে কম কিনো। সো এই যে কম তুমি কিনছো, এটা তুমি আমার ওপরে সঠিক করছো না। আপনারা যদি দেখেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের রপ্তানি আয় এক লাখ কোটি টাকার উপরে। আমরা যে বিমান ক্রয়ের প্রস্তাবনা করছি, সেটার মূল্যমান হয়তোবা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা হবে। সেটা আমাদের মূল্য পরিশোধ করতে হবে ১০ বছরে। ১০ বছরে ইনফ্যাক্ট আরও বেশি সময়ে; কারণ এটার পেমেন্ট শিডিউল অনেক লং টার্ম হয়তোবা ২০ বছরে মূল্য পরিশোধ করতে হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরীন জাহান উপস্থিত ছিলেন।