
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
এক সময় গ্রামাঞ্চলে সহজেই দেখা মিলত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ফল গাছ ডেউয়া। গ্রীষ্মের শেষ ভাগে থোকায় থোকায় ফল ধরত এসব গাছে। কাঁচা অবস্থায় টক আর পাকলে টক-মিষ্টি স্বাদের এ ফল ছিল গ্রামবাংলার অতিপরিচিত এক মৌসুমি ফল।
তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই পরিচিত ডেউয়া ফল কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলাতে আগের মতো আর চোখে পড়ে না। নতুন প্রজন্মের এমন অনেকেই আছেন যারা ফলটির নাম পর্যন্ত জানেন না। অথচ এটি গ্রামীণ ঐতিহ্যেরই একটি অংশ।
পুষ্টিগুণে ভরপুর টক-মিষ্টি স্বাদের দেশীয় ফল ডেউয়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম, ভিটামিন-বি ও আয়রন, যা মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও নানা ঔষধি গুণে ভরপুর এই ফল।
ইউনানি চিকিৎসকদের মতে, ডেউয়া ফলে থাকা ভিটামিন-সি ও ফ্ল্যাভোনয়েড শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা সর্দি-কাশি ও বিভিন্ন সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছাড়া এটি হজমশক্তি বাড়াতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দূর করতে সহায়ক। কম ক্যালরিযুক্ত হওয়ায় ওজন নিয়ন্ত্রণেও এটি উপকারী বলে মনে করা হয়।
জানা গেছে, ডেউয়া গাছের বৈজ্ঞানিক নাম আর্টোকার্পাস লাকুচা। এটি মোরাসিই পরিবারভুক্ত একটি ক্রান্তীয় চিরসবুজ বৃক্ষ। ডেউয়া ফলের ভেতরের অংশ দেখতে কিছুটা কাঁঠালের মতো গুচ্ছাকৃতির। এ ফলের উপরের রঙ কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে হলুদ রঙ ধারণ করে। পাকলে এর ভেতরের শাঁস লালচে হলুদ রঙের হয় এবং স্বাদ টক-মিষ্টি। পাকা ফলের কোয়া নরম ও মোলায়েম হয়। শুধু ফলই নয়, এ গাছের কাঠও বেশ উন্নত মানের বলে জানা যায়। ডেউয়া ফলটি ঢেউয়া, মাদার, ডেউফল, বনকাঁঠাল কিংবা বত্তাসহ আর ও নানা আঞ্চলিক নামে পরিচিত।
সম্প্রতি স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও কিছু ডেউয়া গাছ দেখা গেলেও আগের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। সদর ইউনিয়নের দীর্ঘভূমি এলাকায় দুটি ডেউয়া গাছ দেখা গেছে, এসব গাছে এ বছর প্রচুর ফল ধরেছে। বড় বড় পাতার ফাঁকে ঝুলছে কাঁচা-আধাপাকা ফল। আবার গাছের নিচে পাকা ফল ঝরে পড়ে আছে। স্থানীয়রা ঝরা ফল কুড়িয়ে নিচ্ছেন।
উপজেলার শিদলাই ইউনিয়নের শিদলাই এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নোয়াব মিয়া (৭৬) বলেন, আমাদের ছোটবেলায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ডেউয়া গাছ ছিল। অন্যান্য ফলের মতোই এ ফলেরও তখন বেশ কদর ছিল। আমরা বন্ধুরা মিলে স্কুল থেকে ফেরার পথে গাছে উঠে পাকা ডেউয়া ফল পেড়ে খেতাম। এখন আর আগের মতো এই গাছ চোখে পড়ে না। আগের মতো এসব দেশি ফলের গাছ এখন আর কেউ লাগায় না।
উপজেলা সদরের প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল মালেক (৭৯) বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি কাঁচা ডেউয়া ফল দিয়ে তরকারি রান্না করতেন মা-চাচিরা। সে সময় কাঁচা ডেউয়া ফল দিয়ে ভর্তা বানিয়ে খাওয়া হতো। এখনকার ছেলেমেয়েরা এই ফল চিনেই না।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী আতিয়া রহমান কলি বলেন, ডেউয়া ফলের নাম বাড়ির মুরব্বিদের কাছ থেকে শুনেছি। বাজারেও মাঝে মাঝে দেখা যায়, তবে তা অন্যান্য মৌসুমি ফলের মতো পর্যাপ্ত নয়। তাই আমাদের প্রজন্মের অনেকেই এই ফল সম্পর্কে জানে না। অথচ এই ফলটি বেশ উপকারী।
জামাল হোসেন নামে এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বলেন, দেশীয় ফল শুধু খাদ্য নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অংশ। ডেউয়া ফলের মতো পরিচিত ও উপকারী ফলটি আমাদের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, ডেউয়া একটি অত্যন্ত ভেষজগুণসম্পন্ন উপকারী দেশীয় ফল। এতে থাকা প্রাকৃতিক ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। বিশেষ করে গরমের সময়ে এই ফল শরীরকে সতেজে রাখে এবং হজমশক্তি উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়াও আরও নানা রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে এ ফলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল মতিন বলেন, দেশীয় ফল ডেউয়া একটি পুষ্টিগুণ ও ভেষজগুণসম্পন্ন ফল। কিন্তু এর বাণিজ্যিক চাষ না থাকায় এবং মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় গাছটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। এখনই গাছটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এ ফল আরও দুর্লভ হয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, তবে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বাড়ির আঙিনায় বা আশপাশে দেশীয় ফলের গাছ লাগাতে মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে প্রকৃতি যেমন স্বনির্ভর হয়ে উঠবে এবং মানুষও পাবে পুষ্টির উৎস।