
নিজস্ব প্রতিবেদক
সন্তান আগমনের আনন্দের খবরও কখনো কখনো চরম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার নোয়াখলা গ্রামের দরিদ্র রংমিস্ত্রি পারভেজের সংসারে তেমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পারভেজের ২৪ বছর বয়সী স্ত্রী ফেরদাউস আক্তার সাথীর গর্ভে একসঙ্গে বেড়ে উঠছে পাঁচটি সন্তান। চিকিৎসকের আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টে এই চিত্র ধরা পড়েছে। পাঁচ সন্তানের মা হওয়ার খবরে আনন্দের বদলে এখন চরম উৎকণ্ঠা ও বিষাদের ছায়া পারভেজ-সাথী দম্পতির চোখে-মুখে।
স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, একসঙ্গে পাঁচ সন্তান গর্ভে ধারণ করা মা ও শিশু- সবার জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মা ও গর্ভের সন্তানদের জীবন রক্ষায় এখন ব্যয়বহুল ও উন্নত চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য নিয়মিত চেকআপ, উন্নত পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনে জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জানান, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে উর্বরতার (ফার্টিলিটি) চিকিৎসা ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে এমন ঘটনা প্রতি সাড়ে ৫ কোটি থেকে ৬ কোটি গর্ভধারণের মধ্যে মাত্র একটিতে ঘটে।
তিনি আরও বলেন, মানুষের জরায়ু স্বাভাবিকভাবে একটি মাত্র সন্তান ধারণের উপযোগী। একসঙ্গে ৫টি সন্তান গর্ভে থাকায় ওই মায়ের শরীর প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে। এ ধরনের গর্ভাবস্থায় শতভাগ ক্ষেত্রেই ‘প্রিম্যাচ্যুরিটি’ বা সময়ের অনেক আগেই (সাধারণত ২৬ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে) সন্তান প্রসব হয়ে যায়। ফলে নবজাতকদের ওজন অত্যন্ত কম (৯০০ গ্রাম থেকে ১.৫ কেজি) হয় এবং তাদের ফুসফুস সম্পূর্ণ গঠিত হয় না। জন্মের পরপরই ৫টি শিশুর জন্যই একযোগে উন্নত আইসিইউ, কৃত্রিম অক্সিজেন সাপোর্ট এবং সার্বক্ষণিক নবজাতক বিশেষজ্ঞের (নিওন্যাটোলজিস্ট) তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।
কিন্তু দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করা রংমিস্ত্রি পারভেজের পক্ষে স্ত্রীর সাধারণ ভরণপোষণ চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে গর্ভের পাঁচ সন্তানের অতিরিক্ত যত্ন ও বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার কাছে স্বপ্নের মতো। এই সৌভাগ্য আনন্দ ছাপিয়ে এখন পরিবারটিতে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’র এই সংসারে গর্ভধারণকালীন বিশেষ পুষ্টি ও আসন্ন প্রসবের বিপুল ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য এই পরিবারের নেই।
গর্ভবতী ফেরদাউস আক্তার সাথী আকুতি জানিয়ে বলেন, ডাক্তার বলেছে ঠিকমতো চিকিৎসা না করালে আমার আর বাচ্চাদের বাঁচানো কঠিন হবে। এই কথা শুনে রাতে ঘুম আসে না। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, বাচ্চাগুলো যেন সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখতে পায়।
সন্তানদের পিতা পারভেজ বলেন, আমি দিন আনি দিন খাই। ঘরভাড়া আর বাজারের টাকা জোগাতেই হিমশিম খাই। এখন ডাক্তার-হাসপাতালের এত বড় খরচ আমি কীভাবে দেব? আমার স্ত্রী-সন্তানদের বাঁচাতে আমি সমাজের বিত্তবান মানুষ ও প্রশাসনের কাছে আকুল সহযোগিতা চাই।
এ বিষয়ে স্থানীয় নোয়াখলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইব্রাহীম খলীল সোহাগ বলেন, সাথীর স্বামী ও বাবা দুজনেই শ্রমজীবী মানুষ। এই দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এই চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের এগিয়ে আসা উচিত।
ফেরদাউস আক্তার সাথী বর্তমানে চাটখিলের নোয়াখলা গ্রামে স্বামীর বাড়িতেই আছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, সময়মতো উন্নত হাসপাতালে ভর্তি ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নিবিড় তত্ত্বাবধান ছাড়া মা ও পাঁচ নবজাতকের সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সাথীকে বর্তমানে বিনামূল্যে পরামর্শ দেওয়া চাটখিল নরমাল ডেলিভারি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাহমিনা আক্তার সুবর্ণা বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের এই দরিদ্র পরিবারের পক্ষে ঢাকার পিজি হাসপাতাল বা ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো বড় টারশিয়ারি হাসপাতালের এনআইসিইউ-এর খরচ চালানো অসম্ভব। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে এই স্তরের নিবিড় নবজাতক সেবার অবকাঠামো না থাকায় এই মাকে দ্রুত উচ্চতর সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। কিন্তু যাতায়াত, ওষুধ ও চিকিৎসার আনুমানিক ব্যয়ভার বহন করার মতো ন্যূনতম অর্থনৈতিক সক্ষমতা এই পরিবারের নেই। এমতাবস্থায় মানবিক কারণে অসহায় এই দম্পতির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং প্রশাসনের জরুরি সহযোগিতা প্রয়োজন।