
গৌরনদী প্রতিনিধি // একটা ঘর মানে শুধু চারটি দেয়াল নয়। ঘর মানে স্বপ্ন, সংসার, নিরাপত্তা আর আপনজনকে নিয়ে বেঁচে থাকার ঠিকানা। সেই ঠিকানাই যখন বারবার নদীর স্রোতে হারিয়ে যায়, তখন মানুষ কোথায় দাঁড়াবে? বদরুল আলমের জীবন যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে। একসময় তার বাড়ি ছিল। ছিল উঠান, গাছপালা, হাঁস-মুরগি—ছিল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাজানো সংসার। কিন্তু আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে একদিন সেই বাড়ির অস্তিত্বও মুছে যায়। বসতভিটা হারিয়ে অন্যের জমিতে ঘর তুলে আবারও সংসার গুছিয়েছিলেন বদরুল। কিন্তু নদী তাকে সেখানেও থাকতে দিল না। কয়েক দিন আগে ভাঙনের কবলে পড়ে সেই ঘরটিও চলে গেছে নদীগর্ভে। ফলে এবার শুধু ঘর নয়, হারিয়েছেন শেষ আশ্রয়টুকুও। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখন অন্যের জমিতে পলিথিনের ছাউনি টাঙিয়ে কোনোভাবে দিন কাটছে তার। বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের মিয়ারচর লঞ্চঘাট এলাকার বদরুলের এই গল্প এখন একার নয়। আড়িয়াল খাঁ নদীর অব্যাহত ভাঙনে গত দুই বছরে অন্তত ৪০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গত এক মাসেই নতুন করে আরও পাঁচটি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী যেন শুধু মাটি কাটছে না, কাটছে মানুষের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবনের গল্প। এবার নদীর চোখ স্কুলের দিকেও বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি ভাঙনের মুখে পড়েছে মানুষের চলাচলের রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদীর বোরাদী গরঙ্গল ও মোল্লারখাল এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। একইভাবে গৌরনদী বন্দর থেকে ধামুড়া খালের দক্ষিণ বিল্বগ্রাম এলাকাতেও ভাঙন বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দক্ষিণ বিল্বগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে। বিদ্যালয়ের সামনে খালের পাড় ভেঙে রাস্তার একটি অংশ ধসে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের চলাচলের একমাত্র ব্রিজটিও রয়েছে ঝুঁকিতে। যেকোনো সময় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ। অভিভাবক ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে শিশুদের স্কুলে যাতায়াতই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, গৌরনদী-ধামুড়া খালের তীব্র স্রোতে স্কুলের সামনের রাস্তা ইতোমধ্যে খালের মধ্যে ধসে পড়েছে। একমাত্র ব্রিজটিও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার একমাত্র পথটি বন্ধ হয়ে যাবে। ‘দুইবার ঘর হারিয়েছি, এবার কোথায় যাব?’ মিয়ারচর লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা বদরুল আলম বলেন, “আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে দুইবার বসতভিটা হারিয়েছি। পরে অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকতাম। কয়েক দিন আগে সেই জায়গাটিও নদী নিয়ে গেছে। এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে অন্যের জমিতে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে থাকছি।” বদরুলের মতো নদীতীরের আরও অনেক পরিবার এখন প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। আজ যে জায়গায় ঘর, কাল সেটি নদীর অংশ হয়ে যাবে কি না—সেই দুশ্চিন্তাই তাদের নিত্যসঙ্গী। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা অলিল বেপারী বলেন, আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে শত শত পরিবার বসতভিটা ও জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। বিশেষ করে মিয়ারচর লঞ্চঘাট এলাকায় কয়েক বছর ধরে ভাঙন চলছে। ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। বোরাদী গরঙ্গল ও মোল্লারখাল এলাকার বাসিন্দারাও একই আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, পালরদী নদীর ভাঙনে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে অন্যত্র চলে গেছে। এখন নদীতীরবর্তী রাস্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। জিও ব্যাগে আশার আলো তবে ভাঙন ঠেকাতে কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, মিয়ারচর এলাকায় নদীভাঙন রোধে ১০০ মিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের নির্দেশনা পাওয়া গেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে কাজ শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, বিল্বগ্রাম এলাকায় একটি কাজ চলমান রয়েছে। অপর অংশও পরিদর্শন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ভাঙনকবলিত সব এলাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু নদীর পাড়ে বসবাস করা মানুষগুলোর কাছে এখন সময়টাই সবচেয়ে বড় বিষয়। কারণ, তাদের চোখের সামনে প্রতিদিনই একটু একটু করে সরে যাচ্ছে মাটি—আর সেই মাটির সঙ্গে সরে যাচ্ছে ঘর, স্মৃতি, জীবিকা ও নিরাপদে বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও।