
নিজস্ব প্রতিবেদক // গ্যাস সংকটের কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আবার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। গত রবিবার রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এ ছাড়া গতকাল বিকাল ৫টার দিকে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ১২৩ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না থাকাকে দায়ী করছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কমকর্তারা।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় বাধ্য হয়েই বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তারা বলছেন, এখন গড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার ২০০-৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। যার অধিকাংশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তরল জ¦ালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। বিদ্যুৎ
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, গ্যাস সংকটের বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ সচিব গতকাল পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে ফোন করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখলে জাতীয় গ্রিডে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব, সেসব কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে এবং লোডশেডিংও কমানো সম্ভব হবে। তবে বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়।
গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব বিদ্যুতে
বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের বড় একটি অংশ এখনও গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহে সামান্য ঘাটতিও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। কোনো কোনো কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় চলতে বাধ্য হচ্ছে, আবার কোনো কেন্দ্র পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে যত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সেখানে গ্যাসের চাহিদা প্রায় দুই হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ছাড়া গ্যাসের অভাবে অন্তত অর্ধশতাধিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ আছে। চালু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও আংশিক চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের চাহিদা যখন বেশি থাকে, তখন গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকলে ঘাটতি দ্রুত বেড়ে যায়। বর্তমানে সে পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। একদিকে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে, অন্যদিকে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। গতকাল বিকাল ৫টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দেখা যায়, লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ১২৩ মেগাওয়াট।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের নতুন চাপ
দেশের বিদ্যুৎ খাতে এই সংকট এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন সাম্প্রতিক সময়ে সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
এর আগে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়ে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। গ্যাসের সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং দেশি গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয়টি সমাধান না হলে বিদ্যুৎ খাতেও বারবার একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
এদিকে এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব আমাদের সময়কে বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে চাপ আছে। তবে এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ পুরোপুরি না বাড়লে সেটা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৭১৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ করা হয়েছে। এটা আস্তে আস্তে আরও বাড়বে।
লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, আজ (গতকাল) বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব পেট্রোবংলার চেয়ারম্যানকে ফোন দিয়ে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানও কথা দিয়েছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকটকে শুধু সাময়িক গ্যাস ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিং সাময়িকভাবে কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট সমাধান না করলে বিদ্যুৎ খাতে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।
বিষয়টি সম্পর্কে অধ্যাপক ম. তামিম আমাদের সময়কে বলেন, দেশে জ¦ালানিই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। এ সংকট থেকে চাইলেই দ্রুত উত্তরণ সম্ভব নয়। তবে দেশে শিল্প কারখানা বা বিদ্যমান শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখতে হলেও এখন এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দেশি উৎসগুলো থেকে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানোর জোর চেষ্টা করতে হবে।
শিল্প ও অর্থনীতিতে প্রভাব
লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে জেনারেটরনির্ভরতা ও উৎপাদন ব্যয়। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ক্ষুদ্র ব্যবসা, দোকানপাট ও সেবা খাত। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি একই সংকট যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে, তখন অর্থনীতির ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এখন শুধু বিদ্যুৎ খাতের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে লোডশেডিং কমানোর সবচেয়ে দ্রুত উপায় হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব থাকলে এক খাতের সংকট অন্য খাতকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। গ্যাসের সংকট এখন সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
গত রবিবার রাত ১টায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের ঘটনা সে সংকটেরই বড় উদাহরণ। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো গ্যাস সরবরাহ কত দ্রুত বাড়ানো যাবে এবং চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতি কবে নাগাদ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।