
সোহেল খন্দকার(ঝালকাঠি) প্রতিনিধি: তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম পথিকৃৎ, উপমহাদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং ‘বাংলার বাঘ’ খ্যাত শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক। অথচ যে বাড়িতে তাঁর জন্ম, যে জনপদের মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে তাঁর শৈশবের স্মৃতি, সেই ঐতিহাসিক জমিদারবাড়িই আজ অবহেলা আর অযত্নে জরাজীর্ণ। সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। অথচ যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এই বাড়িটিই হতে পারত ইতিহাসচর্চা, শিক্ষা ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ।
আজ ২৬ অক্টোবর শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭৩ সালের এই দিনে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের মিয়া বাড়িতে, তাঁর নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা ওয়াজেদ আলী ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী এবং মা বেগম সৈয়দুন্নেছা ছিলেন গৃহিণী। জন্মের দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর জন্মস্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি আজও প্রত্যাশিত সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মুখ দেখেনি। ফলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যে।
শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি আজ অবহেলার সাক্ষী
বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে সাতুরিয়া গ্রামের মিয়া বংশের ঐতিহাসিক জমিদারবাড়িটির অবস্থান। বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শের-ই-বাংলার শৈশবের নানা স্মৃতি। বাড়ির বাঁধানো পুকুরে গোসল, পাশের খালে সাঁতার কাটা, গাছ থেকে ডাব পেড়ে খাওয়াসহ তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন স্থানীয়রা। কিন্তু ইতিহাসের সেই সাক্ষী বাড়িটির দালান আজ জরাজীর্ণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগেও বাড়িটিতে শের-ই-বাংলার ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র দেখা যেত। বর্তমানে সেগুলোর অনেক কিছুই আর নেই। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্মৃতিবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সংকট
শের-ই-বাংলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাতুরিয়া মেহেরুন্নেছা মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিও নানা সমস্যায় জর্জরিত। ভবন ও বেঞ্চের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। একদিকে জন্মস্মৃতিবিজড়িত জমিদারবাড়ির জরাজীর্ণ অবস্থা, অন্যদিকে স্মৃতিবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সংকট—সব মিলিয়ে ঐতিহ্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্মরণীয় শের-ই-বাংলা
শিক্ষাজীবন শেষে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠা, জমিদারি শোষণ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা এবং শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সাহসী ভূমিকার জন্যই তিনি ‘শের-ই-বাংলা’ উপাধিতে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
জন্মস্থান দেখতে এসে হতাশ পর্যটকেরা
শের-ই-বাংলার জন্মস্থান ও জীবন-ইতিহাস জানতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাতুরিয়ায় আসেন পর্যটক, শিক্ষার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীরা। কিন্তু ঐতিহাসিক বাড়িটির জরাজীর্ণ অবস্থা এবং পর্যাপ্ত স্মৃতিচিহ্ন ও দর্শনার্থীসুবিধার অভাব তাঁদের প্রত্যাশাকে ম্লান করে দিচ্ছে।
ঢাকার মিরপুর থেকে আসা পর্যটক ফজলে রাব্বি ও স্নিগ্ধা সুলতানা পিংকী জানান, শের-ই-বাংলার জীবন ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে এবং তাঁর জন্মস্থান দেখতে তাঁরা সাতুরিয়ায় এসেছেন। তবে ঐতিহাসিক বাড়িটির বর্তমান অবস্থা দেখে তাঁরা হতাশ হয়েছেন।
সংরক্ষণে উদ্যোগ আছে, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা
শের-ই-বাংলার জন্মভিটা সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় সাত বছর আগে তাঁর জন্মকক্ষের আঁতুড়ঘরের ভেতরের কিছু অংশ সংস্কার করা হয়। এ ছাড়া বাড়ির সামনে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে সংক্ষেপে তাঁর জীবনী তুলে ধরা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু আঁতুড়ঘর সংস্কার কিংবা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণই যথেষ্ট নয়। পুরো জমিদারবাড়ির স্থায়ী সংস্কার, ঐতিহাসিক স্থাপনার যথাযথ সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাড়িটির ইতিহাস ও শের-ই-বাংলার জীবনসংগ্রাম তুলে ধরতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
স্মৃতি জাদুঘর ও লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দাবি, শের-ই-বাংলার জন্মস্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক জমিদারবাড়িটি দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণ করে সেখানে তাঁর নামে একটি স্মৃতি জাদুঘর এবং সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা হোক। দর্শনার্থীদের জন্য শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে সাতুরিয়ার এই ঐতিহাসিক স্থানটি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবেই নয়, বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠবে। এতে নতুন প্রজন্ম শের-ই-বাংলার জীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জনকল্যাণমূলক অবদান সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরী বলেন, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মস্মৃতি সংরক্ষণ এবং সেখানে জাদুঘরসহ আরও কিছু স্থাপনা নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ভবনটি তালিকাভুক্ত করেছে। জন্মকক্ষের আঁতুড়ঘর সংস্কার এবং ভবনের সামনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কাজও করা হবে।
ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; ইতিহাসের সাক্ষী স্থাপনাগুলোও একটি জাতির পরিচয় ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মভিটা তাই শুধু সাতুরিয়ার সম্পদ নয়, এটি সমগ্র বাংলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাসময়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে অবহেলা ও সময়ের ক্ষয়ে হারিয়ে যেতে পারে অমূল্য ঐতিহ্যের স্মারক। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয়দের প্রত্যাশা—আর বিলম্ব নয়, দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শের-ই-বাংলার স্মৃতিবিজড়িত জমিদারবাড়িকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক তার প্রাপ্য মর্যাদা