
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার // দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ জনপদে এবার সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। একসময় লবণাক্ততার কারণে যে জমিতে ধান ছাড়া অন্য ফসল ফলানো ছিল অনেকটাই কঠিন, সেই জমিই এখন নানা জাতের সবজিতে ভরে উঠেছে। মৎস্য ঘেরের ভেড়ি, বসতবাড়ির আঙিনা ও ফসলি জমিতে ফলছে শসা, লাউ, কুমড়া, করলা, ঝিঙে, বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি।
কৃষকের মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। ফলন ভালো হওয়ায় প্রথমদিকে কৃষকের চোখেমুখে ছিল স্বস্তি ও আশার ঝিলিক। কিন্তু উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় অনেক সবজির দাম কমে গেছে। ফলে বাম্পার ফলনও অনেক কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার কারণ।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, চিতলমারী, মোল্লাহাট, ফকিরহাট, মোংলা, রামপাল, বাগেরহাট সদর, কচুয়া ও শরণখোলা—জেলার নয়টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে ব্যাপকভাবে শসাসহ বিভিন্ন সবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মোরেলগঞ্জে শসার উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক ট্রাকে করে শসাসহ নানা ধরনের সবজি দেশের বড় বড় শহরের বাজারে পাঠানো হচ্ছে।
সরেজমিনে মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফসলি জমি ও মৎস্য ঘেরের ভেড়িতে সারি সারি শসার গাছ। কোথাও গাছে ঝুলছে অসংখ্য শসা, কোথাও আবার কৃষকেরা ব্যস্ত ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে। ভোর থেকেই শুরু হয় শসা সংগ্রহ। পরে পাইকারি ব্যবসায়ীরা কৃষকের বাড়ি কিংবা ক্ষেতের পাশ থেকেই তা কিনে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষকেরা জানান, শসা একটি স্বল্পমেয়াদি সবজি। বীজ রোপণের ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। ফলন শুরু হওয়ার পর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত গাছ থেকে শসা সংগ্রহ করা যায়। যথাযথ পরিচর্যা, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ ব্যবহার করা হলে এক একর জমি থেকে প্রতিদিন ৬ থেকে ৯ মণ পর্যন্ত শসা পাওয়া সম্ভব।
জেলায় ৯০ হাজার টনের বেশি শসা উৎপাদনের সম্ভাবনা
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার নয়টি উপজেলায় শসার ব্যাপক ফলন হয়েছে। এ বছর জেলায় ৯০ হাজার টনের বেশি শসা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে মোরেলগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি শসা উৎপাদন হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত শসা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক কৃষক কোনো দালাল ছাড়াই সরাসরি পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ফসল বিক্রি করতে পারছেন। এতে পরিবহন ও মধ্যস্বত্বভোগীর খরচ কমে যাওয়ায় কিছু কৃষক তুলনামূলক ভালো দামও পাচ্ছেন।
মোরেলগঞ্জের কৃষক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “এক একর জমিতে শসার চাষ করেছি। গত দশ দিন ধরে বিক্রি শুরু করেছি। প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট মণ পর্যন্ত শসা বিক্রি করি। এবার ফলনও অনেক ভালো হয়েছে। দামও মোটামুটি ভালো পাচ্ছি।”
১৩ নম্বর নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের গুয়াতলা গ্রামের শসাচাষি সাব্বির হোসেন সুমনসহ কয়েকজন কৃষক জানান, বিভিন্ন ধরনের সবজির বীজ বপন করেছেন তারা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর শসার ফলন খুব ভালো হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগ থেকেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।
কৃষকেরা জানান, বর্তমানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতি কেজি শসা ১৩ থেকে ১৫ টাকা অথবা প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। এ দাম স্থিতিশীল থাকলে তারা মোটামুটি লাভ করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
মোরেলগঞ্জে ৬০ হাজার টন শসা উৎপাদনের আশা
মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে সবজি আবাদের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার সময়মতো বীজ ও সার সরবরাহ এবং ঋণপ্রবাহ সচল রাখায় এ বছর বিভিন্ন সবজির, বিশেষ করে শসার বাম্পার ফলন হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এ বছর উপজেলায় প্রায় ৬০ হাজার টন শসা উৎপাদন হবে। কৃষকদের কারিগরি সহযোগিতা, চাষাবাদ পদ্ধতি এবং বাজারজাতকরণের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা যাতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পান, সেজন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।”
চিতলমারীতেও ঘেরের ভেড়িতে সবজির সমারোহ
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার কলাতলা, হিজলা, বড়বাড়িয়া, শিবপুর, চিতলমারী সদর, চরবানিয়ারী ও সন্তোষপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য ঘেরের পাড় ও ভেড়িতে ব্যাপকভাবে সবজি চাষ করা হয়েছে। লাউ, কুমড়া, করলা, শসাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করেছেন কৃষক-কৃষাণিরা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম করে তারা এসব ফসল উৎপাদন করছেন। অনেক কৃষক ব্যাংক, এনজিও ও স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদে বিনিয়োগ করেছেন। তাই বাজারদর কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের টাকা ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
এলাকার কৃষকেরা বলেন, সবজি ও চিংড়ি চাষ করে তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। উৎপাদিত সবজি প্রতিদিন পাইকারদের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করছেন, ভোক্তা পর্যায়ে সেই পণ্যের দাম অনেক বেশি—এ বৈষম্যও তাদের হতাশ করছে।
শসা ও করলার দাম কমায় হতাশ কৃষক
চিতলমারী উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের সবজি চাষি সুব্রত মণ্ডলসহ কয়েকজন কৃষক জানান, ভালো দাম পাওয়ার আশায় ঋণ নিয়ে তারা সবজি চাষ করেছেন। কিন্তু এখন বাজারদর কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচই উঠছে না।
সুব্রত মণ্ডল বলেন, “মানুষের কাছ থেকে ঋণ করে সবজি চাষ করেছি ভালো দাম পাব বলে। এখন দেখছি খরচের টাকা ঘরে তোলাই দায়। বর্তমানে শসা প্রতি কেজি ৮ থেকে ১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। করলা আগে যেখানে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা মণ বিক্রি হতো, এখন অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এ অবস্থায় কৃষকের বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।”
কৃষকদের অভিযোগ, সবজির বাজারদর কমে যাওয়ার পেছনে অতিরিক্ত উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো কারসাজি আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মাঠে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে সবজি কিনে শহরের বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হলে প্রকৃত লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
লবণাক্ত জমিতে কৃষি বিপ্লব
মোরেলগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটি ও বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, কৃষকদের সার, বীজ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করে আসছে। তবে দরিদ্র ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য আরও বেশি সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “একসময় লবণাক্ততার কারণে আমার এলাকার অনেক জমিতে ধান চাষ ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা সম্ভব ছিল না। বর্তমানে ওয়াপদার বেড়িবাঁধের কারণে মিঠাপানির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে কৃষকেরা নতুন নতুন ফসল উৎপাদন করছেন এবং এলাকায় এক ধরনের কৃষি বিপ্লব ঘটেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিভিন্ন সিড কোম্পানির পক্ষ থেকেও দরিদ্র কৃষকদের মাঝে মাঝে সার ও বীজ দিয়ে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারিভাবে অত্যাধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে বা বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে কৃষকের চাষাবাদের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে।”
১ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ
চিতলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সিফাত-আল-মারুফ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ১ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল জাতের লাউ, কুমড়া, করলা, শসাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “এ বছর সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষি অফিস থেকে চাষিদের চাষাবাদ বিষয়ে পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত ফলনের কারণে অনেক সময় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে বাজারদর কমে যেতে পারে।”
বাজার মনিটরিং জোরদারের দাবি
বাগেরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আব্দুস ছালাম তরফদার বলেন, উপজেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিংয়ের তেমন ব্যবস্থা নেই। তবে সবজির বাজারদর কমে যাওয়ার পেছনে কারও কারসাজি রয়েছে—এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা হবে।
তিনি বলেন, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য নির্ধারিত স্থান রয়েছে। কৃষকেরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে পণ্য বিক্রির সুযোগ নিতে পারেন।
কৃষকের ঘামেই উৎপাদন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি
কৃষকের মাঠে বাম্পার ফলন হলেও যদি সেই ফসলের ন্যায্য দাম না মেলে, তাহলে উৎপাদনের আনন্দ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় হতাশায়। বিশেষ করে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করা কৃষকের জন্য বাজারদর কমে যাওয়া মানে শুধু লাভ না হওয়া নয়—বরং নতুন করে ঋণের বোঝা বাড়া।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন মৌসুমে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপ থাকলে তা বন্ধ করতে হবে। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কৃষক যদি তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পান, তাহলে আজকের বাম্পার ফলন আগামী দিনের কৃষি উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
সুন্দরবনের উপকূলীয় এই জনপদে লবণাক্ত জমিকে সবুজ ফসলের মাঠে পরিণত করে কৃষকেরা যে সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন, সেই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না—ফসলের ন্যায্য বাজারদর, সহজ ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ ও সরাসরি বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তাও দিতে হবে। তাহলেই সবুজে ভরা মাঠ সত্যিকার অর্থে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে।