
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য এক স্মারক বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামের বারো আউলিয়ার দরবার শরিফ। প্রায় ৬০০ বছরের এ দরবারে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের আগমন ঘটে। নানা লোককথা, ধর্মীয় আচার ও উৎসব ঘিরে স্থানটি হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের অন্যতম ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এলাকাটিতে ১২ জন আউলিয়া বাস করতেন। তারা নির্জনে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। পরে তারা একসঙ্গে গায়েব হয়ে যান। সেই থেকেই স্থানটি বারো আউলিয়ার দরবার নামে পরিচিতি পায়। সরেজমিন দেখা যায়, বড় একটি পাকুড়গাছের শিকড় ও ডালের মধ্যে ঘেরা দরবারের মূল অংশ। গাছটির ভেতরে একটি রহস্যময় সুড়ঙ্গ রয়েছে। একসময় জমিদারের সঙ্গে আউলিয়াদের দূরত্ব তৈরি হলে এ সুড়ঙ্গ দিয়েই তারা গায়েব হয়ে যান বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।
সুড়ঙ্গটির অবস্থান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। একসময় ভক্তরা দরবারের উত্তর পাশে থাকা সুড়ঙ্গপথে দুধ ঢেলে দিতেন। সেই দুধ কাছের একটি পুকুরে গিয়ে জমা হতো। এ কারণে পুকুরটির নাম হয় দুধ পুকুর। পাকুড়গাছটির বিভিন্ন ডাল ও শিকড়ে এখনো অসংখ্য পলিথিন ও কাপড় বাঁধা দেখা যায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মনের আশা লিখে পলিথিন বা কাপড়ে বেঁধে গাছের সঙ্গে রাখলে সেই আশা পূরণ হয়। আশা পূরণ হলে তা নিজ দায়িত্বে খুলে নেওয়ার রীতিও রয়েছে।
দরবারের ইতিহাসের সঙ্গে মাছিম শাহ নামে এক পীরের নামও জড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দক্ষিণাঞ্চলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি এলাকাটিতে বসবাস করতেন। তার আমন্ত্রণেই বারো আউলিয়া এ অঞ্চলে এসেছিলেন। দরবার প্রাঙ্গণেই মাছিম শাহের কবর রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আউলিয়ারা চলে যাওয়ার পর দরবেশ ফকির জালাল আরেফিন দরগাহ ও মাজারের তত্ত্বাবধান করেন। তবে তাকে দরবারটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করা হয় না।
দরবারটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে শুধু মুসলিম ধর্মাবলম্বীরাই আসেন না, সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও দীর্ঘদিন ধরে আসছেন। মুসলমানরা নামাজ আদায় ও কবর জিয়ারত করেন। অন্যদিকে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পূজা-অর্চনা করেন। একই প্রাঙ্গণে দুই ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালনের এ চিত্র স্থানীয়দের কাছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
প্রতি বছর ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে এখানে তিন দিনব্যাপী মেলা বসে। এ ছাড়া দোল পূর্ণিমা, লক্ষ্মী পূর্ণিমা ও অগ্রহায়ণ মাসের ১০ তারিখে ওরস মাহফিলের আয়োজন করা হয় বলে জানান দরবার সংশ্লিষ্টরা।
মাজারের প্রবেশপথের ডান পাশে রয়েছে লম্বা আকৃতির একটি কালো পাথর। পাথরটির গায়ে সিঁদুর ও সরিষার তেল দেখা যায়। স্থানীয়দের কেউ এটিকে শিব পাথর আবার কেউ শিবলিঙ্গ বলে থাকেন। তবে পাথরটির ইতিহাস বা উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভাষ্য, নতুন বিয়ের পর নির্ধারিত তিথিতে নবদম্পতিরা ওই পাথরে সিঁদুর ও সরিষার তেল দিয়ে পূজা করেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ রীতিকে তারা ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে পালন করছেন।
দরবারের পূর্ব পাশে রয়েছে নারীদের নামাজ আদায়ের স্থান। স্থানীয়দের দাবি, প্রাচীন সময়ে এখানে একটি মসজিদ ও ঘাটলা ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই স্থাপনার অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে। বর্তমানে যে স্থানে ঈদগাহ রয়েছে, সেখানেই পুরোনো মসজিদ ও ঘাটলা ছিল। বর্তমানে দরবারের মূল অংশের প্রবেশমুখে নতুন নকশায় একটি দোতলা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।
বারো আউলিয়ার দরবার প্রতিষ্ঠার সময়কাল নিয়েও রয়েছে ভিন্ন তথ্য। ইতিহাসবিদ সিরাজউদ্দিন আহমেদ তার বরিশাল বিভাগের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭) এ দরবার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, দরবারে পালিত ৫৬৫তম ওরস মাহফিলের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার বছর ধরা হয় ১৪৫৭ সাল। তবে ওরসের এ গণনার ঐতিহাসিক ভিত্তি বা নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।