নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপ -প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমরানকে ঘিরে হঠাৎ সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ এখন নগরজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সরকারি চাকরিতে যোগদানের মাত্র আট বছরের মাথায় নগরীতে বহুতল ভবন নির্মাণ, গ্রামের বাড়িতে মাছের ঘের, বাগানবাড়ি ও বিপুল সম্পদের মালিকানা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও সাধারণ জীবনযাপন করা পরিবারটির আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন এখন প্রকাশ্য আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
বরিশাল নগরীর নবগ্রাম রোড এলাকার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের রুইয়ার পোল সমীল সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে একটি তিনতলা ভবনের নির্মাণকাজ। ইতোমধ্যে প্রথম তলার কাজ প্রায় শেষ। ভবনের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি বাণিজ্যিক দোকানঘর। শ্রমিকদের আনাগোনা, নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ আর আধুনিক নকশার স্থাপনাটি স্থানীয়দের দৃষ্টি কাড়ছে প্রতিনিয়ত।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ভবনটির নির্মাণ ব্যয় কয়েক কোটি টাকা হতে পারে। তাদের প্রশ্ন, সরকারি চাকরিজীবনের অল্প সময়ের মধ্যেই এত বড় বিনিয়োগের উৎস কী?
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, আমরা বহু বছর ধরে এখানে আছি। আগে তাদের অবস্থা সাধারণ ছিল। এখন হঠাৎ এত বড় বাড়ি, জমি আর ব্যবসার মতো স্থাপনা তৈরি হওয়ায় মানুষ নানা প্রশ্ন তুলছে।
আরেকজন বাসিন্দা বলেন, বাড়ির ডিজাইন, কাজের মান আর ব্যবহার করা উপকরণ দেখলেই বোঝা যায় ব্যয় অনেক বেশি। সাধারণ চাকরির বেতনে এমন নির্মাণ সম্ভব কি না, সেটি তদন্ত হওয়া উচিত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ইমরান ২০১৭ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখায় উপ -প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বপূর্ণ এ শাখায় কর্মরত থাকার সুবাদে তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ ও প্রভাব ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো সরকারি নথি এখনো সামনে আসেনি।
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমরান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,এখানে আমার কোনো সম্পত্তি নেই। বাবা অবসরে যাওয়ার পরে এগুলো করেছেন।
তবে তার এই বক্তব্য ঘিরেও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। অনুসন্ধানে জানা যায়, ইমরানের পিতা মো. ইউসুফ আলী হাওলাদার বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে কর্মরত ছিলেন এবং ২০২৩ সালে অবসরে যান। এলাকাবাসীর ভাষ্য, একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর অবসরের পর স্বল্প সময়ে কয়েক কোটি টাকার ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, চাকরিজীবনের সময়েও ইউসুফ আলী হাওলাদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রামাণ্য নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইমরানের গ্রামের বাড়িতেও রয়েছে মাছের ঘের, বাগানবাড়ি ও একাধিক ভবন। এছাড়া তার নামে-বেনামে বিভিন্ন এলাকায় জমি ও সম্পত্তি থাকার কথাও আলোচনা রয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি দাবি করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি ইমরান।
স্থানীয় সরকার বিভাগের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসনিক শাখাগুলোতে কাজের সুযোগকে কেন্দ্র করে অনেক সময় প্রভাব বিস্তার ও অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী ও জমি ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, “কোনো সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধে যদি আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি তদন্তের আওতায় আনা উচিত। সম্পদের উৎস বৈধ হলে তদন্তেই সেটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
সুশাসন নিয়ে কাজ করা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। তাদের ভাষ্য, অভিযোগ উঠলেই সেটি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হলে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
বরিশালের সচেতন মহলের দাবি, ইমরান ও তার পরিবারের সম্পদের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা না করার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন আইনজীবীরা।