
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল।।
বরিশালের বাকেরগঞ্জের চরাদী বলাইকাঠি গ্রামে স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি পরিবারকে মিথ্যে মামলাসহ নানানভাবে হয়রানি করছে কতিপয় ব্যক্তি-বিশেষ। ষাটোর্ধ্ব শংকর রঞ্জন তালুকদারের ভূ-সম্পত্তি জবরদখল করতে একই গ্রামের বাসিন্দা অজেদ আলী খা এবং তার চাচাতো ভাই মজিবর খা ও দেলোয়ার খা একট্টা হয়ে একের পর এক অপকৌশল অবলম্বন করে চলছে। প্রথমে শংকর রঞ্জন তালুকদারের ওপর হামলা এবং তাকেসহ দুই সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যে মামলা করে হয়রানি করার পর সবশেষে পরিবারটিকে শায়েস্তা করতে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছে। শংকর রঞ্জনসহ তার ছেলেদের মারধর করাসহ হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। এমনকি সিনিয়র সিটিজেন শংকর রঞ্জনের চাষাবাদ করা জমির ধান সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে কেটে নেওয়ার পায়তারা চালিয়ে আসছে। ধারাবাহিক হামলা-মামলা এবং হয়রানিতে তটস্থ পরিবারটি এই সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে উপায়ন্ত না পেয়ে সর্বশেষ সংশ্লিষ্ট বাকেরগঞ্জ থানায় উল্লেখিত তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। শংকর রঞ্জনের বড় ছেলে শম্ভুনাথ তালুকদার সোমবার রাতে ডায়েরিটি করেছেন। থানা পুলিশ বলছে- সংখ্যালঘু পরিবারকে হয়রানির এই ঘটনাটি তারা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, ওই অঞ্চলের একসময়ের প্রতাপশালী খগেন্দ্রনাথ তালুকদারের ছেলে শংকর রঞ্জন পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত জমির একটি অংশ দখল নিতে অপতৎপরতা চালিয়ে আসছিল অজেদ আলী। কিন্তু কিছুতেই তিনি জমিটি আয়ত্ব করতে না পেরে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে চাষবাদ করার প্রাক্কালে দলবল নিয়ে শংকর রঞ্জনের ওপর হামলা করে। এবং একপর্যায়ে তাকে মারধর করাসহ কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। সেই নৃশংস ঘটনায় শংকর রঞ্জনের ছেলে শম্ভুনাথ বাকেরগঞ্জ থানায় ৩২৬, ৩২৫, ৩০৭ সহ একাধিক ধারায় একটি মামলা করলে পুলিশ অজেদ আলীকে গ্রেপ্তার করে।
ভুক্তভোগী পরিবারটি অভিযোগ, অজেদ আলী জামিনে মুক্ত হয়ে বেশিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং চাচাতো ভাই মজিবর ও দেলোয়ারের সমন্বয়ে স্থানীয় আরও কয়েকজনকে নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে হয়রানি শুরু করে। তাদের ধারাবাহিক হয়রানিতে এতদিন সংখ্যালঘু পরিবারটি নিশ্চুপ থাকায় এখন নানাভাবে ভয়-ভীতি দেখানোসহ শংকর রঞ্জন ও তার দুই ছেলেকে কোপানোর পাশাপাশি খুন-জখমের হুমকি অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয় জনপ্রতিধি ও সুশীল মহল এই বিষায়াদী প্রত্যক্ষ করলেও শংকর রঞ্জন জাতে হিন্দু হওয়ায় দরুন তার পক্ষে কেউ অগ্রসর হচ্ছে না (!) বিশেষ মহলের এই নিরবতা স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তারা চাপের মুখে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারছে না বা সাহস দেখাচ্ছে না। এর আগে শংকর রঞ্জন ও তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মিথ্যে মামলা দিয়ে হয়রানি করে অজেদ আলী।
শংকর রঞ্জনের ছেলে শম্ভুনাথের করা সাধারণ ডায়েরি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৫ আগস্ট যে ভূ-সম্পত্তি চাষ করতে গিয়ে তার বাবা হামলার শিকার হয়েছিলেন সেই জমির ধান কাটতে এখন নানানভাবে বাধা-বিপত্তিসহ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে অজেদ আলী গংরা হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে যে ওই ভূমির ধান কাটতে গেলে শংকর রঞ্জনসহ তার ছেলে এবং বর্গাচাষীকে কুপিয়ে জখম এবং লাশ ফেলে দেওয়া হবে। প্রকাশ্য এই হুমকি শংকরের পরিবারসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীলমহলের ভুমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রবীণ ব্যক্তিত্ব শংকর রঞ্জন জানিয়েছেন, তিনি যে জমিতে চাষাবাদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে, সেই ভূমি নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। অথচ ভূমিটি দখল নেওয়াসহ সেখানকার ধান কাটতে অজেদ আলীসহ তার চাচাতো ভাইয়েরা বাধা দিচ্ছে। এমনকি প্রকাশ্য বলে বেড়াচ্ছে ক্ষেতে নামলে কুপিয়ে লাশ ফেলে দেওয়া হবে। তাদের এই ধারাবাহিক সন্ত্রাসে ওষ্ঠাগত হয়ে সর্বশেষ সোমবার রাতে তার ছেলে শম্ভুনাথ বাকেরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। বিপরিতে পুলিশ সেই ভূমির ধান কাটতে সহযোগিতা করাসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণের আশ্বাস দিলেও জনপ্রতিনিধি ও সুধীমহলের নিশ্চুপ থাকা নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে আতঙ্ক-উদ্বেগ বেড়েই চলছে।
একটি সংখ্যালঘু পরিবারকে হামলা-মামলা এবং সর্বশেষ খুনের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সদস্যসচিব ডা. মণীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন- যেহেতু ভুক্তভোগী পরিবারটি উপায়ন্ত না পেয়ে আইনি সুবিধা পেতে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছে, সেক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে। আমরা আশাবাদী পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থাগ্রহণ করবে। সেক্ষেত্রে কোনো রকমের ব্যত্যয় ঘটে তাহলে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলকে সাথে নিয়ে পরিবারটি পাশে দাঁড়াবে।
বাকেরগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাকসুদুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগী শংকর রঞ্জনের ছেলে সোমবার থানায় এসেছিলেন, তার বক্তব্য শুনে একটি সাধারণ ডায়েরি নথিভুক্ত করে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্তরা ওই ভূমির ধান কাটার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে কঠোর ব্যবস্থাগ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
Leave a Reply