
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
প্রবাসে ১৪ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন বাবা। তখনও বুঝে উঠতে পারেননি জীবনের কঠিন বাস্তবতা। সময়ের পরিক্রমায় বড় হয়ে সেই ছেলেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে বুনেছিলেন সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু নিয়তির নির্মম খেলায় বাবার মতোই প্রবাসের মাটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হলো জুবায়ের আহমদকে।
শুধু জুবায়ের নন, একই দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে কানাইঘাট উপজেলার গাছবাড়ী এলাকার আরও চার প্রবাসীর প্রাণ। এক মুহূর্তে নিভে গেছে পাঁচ পরিবারের আশার প্রদীপ। পুরো এলাকায় এখন শুধু কান্না, শোক আর অপেক্ষা প্রিয়জনদের মরদেহ শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষা।
রোববার (২১ জুন) সকালে কাতারের শাহানিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
একসঙ্গে ৫ প্রবাসীর মৃত্যুতে শোকে কাতর গ্রামবাসী
কক্সবাজারে বাড়ছে এইচআইভি রোগী, ৯৩ শতাংশই রোহিঙ্গা
নিহতরা সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নুরের ছেলে জিবাল আহমদ (৩৫), মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৩৮), আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ (২৭), একই গ্রামের মড়া মিয়ার ছেলে জুবের আহমদ (২৮) এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ি গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদির আহমদ (৩৩)।
জুবায়ের আহমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। মা জাহানারা বেগম বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ১৪ বছর আগে আমার স্বামীও বিদেশে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছি। সংসারের হাল ধরবে বলে কাতারে পাঠিয়েছিলাম। এখন সেও চলে গেল। আল্লাহ আমার সবকিছু নিয়ে গেলেন।
জুবায়েরের চার বছরের শিশু সন্তান এখনও বুঝতে পারেনি তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন আগেও ফোনে কথা হয়েছিল। দেশে ফিরে সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন এখন শুধুই স্মৃতি।
একই গ্রামের জসিম উদ্দিনের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। দুই শিশুসন্তানকে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন স্ত্রী শাহিনা বেগম। তিনি বলেন, আমাদের সংসারটা ওর আয়ের ওপরই চলত। এখন দুই সন্তান নিয়ে কীভাবে জীবন চলবে জানি না। সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেছে।
অপর নিহত কাদের আহমদের বাবা বাহার উদ্দিন জানান, পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন নিয়ে চার বছর আগে কাতারে গিয়েছিলেন তার ছেলে। আগামী মাসেই দেশে ফেরার কথা ছিল। বাড়ির সবাই অপেক্ষায় ছিল সেই দিনের জন্য। কিন্তু জীবিত নয়, মরদেহ হয়ে ফিরতে হবে তাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নিহত পাঁচজনই সাধারণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান। পরিবারের সুখের জন্য, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য, বৃদ্ধ মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তারা প্রবাসে গিয়েছিলেন। জীবিকার তাগিদে হাজার মাইল দূরে থাকা মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত নিজ গ্রামেই ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে।
কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতোই তারা ভোরে কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। পথে তাদের বহনকারী পাজেরো টাইপের একটি গাড়ি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করছে স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশ।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কানাইঘাটের গাছবাড়ি এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠেছে পুরো এলাকা। একসঙ্গে পাঁচজন তরুণের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
এছাড়া দুর্ঘটনার পরপরই কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ও স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। মরদেহ দেশে পাঠাতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর কালবেলাকে বলেন, নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনই তার ইউনিয়নের বাসিন্দা। তাদের অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়।
তিনি সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তার দাবি জানান।
এদিকে, কাতারে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচজন বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এমন আকস্মিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়া কাতারস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।