
ভোলা প্রতিনিধি // ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলে মহিষ চুরি ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। গভীর রাতে নদীপথে ট্রলার নিয়ে বিভিন্ন বাথানে ঢুকে সংঘবদ্ধ চক্র মহিষ নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন খামারিরা। তাদের দাবি, গত ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০টি মহিষ চুরি হয়েছে।
সম্প্রতি দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের বৈরাগীর চর থেকে এক রাতেই ২৫টি মহিষ চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটে। খামারিদের অভিযোগ, চোরেরা সাধারণত গভীর রাতে নির্জন বাথানগুলোতে হানা দেয়। মহিষ নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দিলে অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।
বৈরাগীর চরের বাথানমালিক কাশেম মাস্টার বলেন, ১০ বছর ধরে লিজ নিয়ে সেখানে মহিষ পালন করছেন তিনি। আগে বাথানের জন্য বছরে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা লিজ দিতে হলেও এবার দিতে হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। ৫ আগস্টের আগে চুরির ঘটনা না ঘটলেও এরপর তার বাথান থেকে ৪-৫ দফায় গরু-মহিষ চুরি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬৫০টি মহিষ রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৩৫টি মহিষ চুরি হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা।
তিনি বলেন, ৮-৯ জন রাখালের পেছনে প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়। এরপরও চুরি অব্যাহত থাকলে মহিষ পালন বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মহিষের মালিক আলাউদ্দিন সাজি বলেন, আগে বন্যা ও জোয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও এখন মহিষ চুরির আতঙ্কে ঘুম হারাম হয়ে গেছে। জোয়ারের সময় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চোরেরা মহিষ নিয়ে যায়। প্রাণের ভয়ে রাখালরাও বাধা দিতে পারেন না। চুরি ও ডাকাতি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল বাড়ানোর পাশাপাশি মহিষের জন্য নির্দিষ্ট চারণভূমি তৈরির দাবি জানান তিনি।
আরেক বাথানমালিক ইকবাল হোসেন রাজু বলেন, বংশপরম্পরায় তারা চরে মহিষ পালন করে আসছেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে চরম আতঙ্কে দিন কাটছে। চর থেকে কোনো ফোন এলেই ভয় হয়। মহিষের টক দই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও খামারিদের নিরাপত্তা কিংবা আধুনিক বাথান তৈরিতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও ফল পাওয়া যায়নি। রাতে সরকারি টহল বাড়ানো হলে চুরি কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, বৈরাগীর চর ছাড়াও ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, চরফ্যাশন ও মনপুরার দুর্গম চরাঞ্চল থেকে গত ছয় মাসে ২৫০ থেকে ৩০০টি মহিষ চুরি হয়েছে। চোরচক্র ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়ে এক চর থেকে অন্য চরে দ্রুত চলে যায়। নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল না থাকায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ খামারিদের।
এ বিষয়ে পূর্ব ইলিশা সদর নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আশিকুর রহমান বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম। এর পাশাপাশি নৌযান ও পরিবহন সংকটও রয়েছে। ফলে বিশাল নদী ও দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত টহল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জামিলুর রহমান বলেন, নৌপথে অপরাধ দমনে কোস্টগার্ড তৎপর রয়েছে। এরই মধ্যে একাধিক চোরচক্রকে আটক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে খামারিদের সঙ্গে আলোচনা করে চুরির মূল চক্রকে ধরতে দ্রুত অভিযান চালানো হবে।
ভোলা জেলা পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার বলেন, মহিষ চুরি ঠেকাতে বাথানমালিকদের সমিতি গঠন, রাখালদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লাঠি-বাঁশি সরবরাহ এবং জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে কল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।