কলকাতায় দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে শিক্ষক হিসেবে পান কাদম্বিনী। পরে এই দ্বারকানাথেরই অর্ধাঙ্গিনী হন কাদম্বিনী। পদবি বদলে বসু থেকে হন গাঙ্গুলী। দুই বছরের মধ্যেই কাদম্বিনীদের এ স্কুলটিও সামাজিক চাপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আর এ সময় স্কুলটিকে বেথুন স্কুলের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। মেয়েদের একটি ব্যাচকে এনট্রান্স পরীক্ষায় বসানোর লক্ষ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যায় বেথুন স্কুল। সেই ব্যাচেরই ছাত্রী ছিলেন কাদম্বিনী; কিন্তু সেই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি না থাকায় নারীদের এনট্রান্স পরীক্ষায় বসার কোনো সুযোগ ছিল না। শিক্ষকদের সঙ্গে কাদম্বিনী বসুও আওয়াজ তোলেন, চাইলেন পরীক্ষায় বসার অনুমতি। অবশেষে ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের এক সভায় সেই অনুমোদন পান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। কিছু মানুষ কটাক্ষ করলেও সমাজের একাংশ ছাত্রীদের উৎসাহ দিতে থাকেন।
শত শত ছাত্রের মধ্যে একমাত্র ছাত্রী হিসেবে এনট্রান্স পরীক্ষা দেন কাদম্বিনী বসু। আর প্রথমবারেই রেকর্ডের খাতায় নাম ওঠান। মাত্র এক নম্বরের জন্য প্রথম শ্রেণি না পেলেও দ্বিতীয় শ্রেণি নিয়ে ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে প্রবেশিকা পাস করেন। শেষমেশ কাদম্বিনীর এন্ট্রান্সের সাফল্যের কারণেই স্কুলের একাংশ কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরুর অনুমোদন পেল। তৈরি হলো বেথুন কলেজ। একমাত্র ছাত্রীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করল এশিয়ার প্রথম মহিলা কলেজ। সেই কলেজ ভবনেরই একটি ঘরে থাকা ও পড়াশোনা করতেন কাদম্বিনী। সেখানেই মনে মনে গোপনে লালন করতেন এক স্বপ্নকে। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে এফএ পরীক্ষায়ও সফল হন কাদম্বিনী। এবার বিএ পড়তে চাইলেন কাদম্বিনী। ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে সেই ব্যবস্থাও হলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বেথুন কলেজে যখন বিএ পড়া শুরু করলেন, সেই সময়ে সারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কোনো নারী গ্র্যাজুয়েট নেই। তিনি নারী শিক্ষা বিস্তারে পথিকৃৎ বেথুন কলেজ থেকে ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কাদম্বিনী গণিত বেছে নিয়ে ইতিহাস গড়েন।
পরে স্নাতক হওয়ার পর তিনি ডাক্তারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ব্রিটিশ ভারতের প্রথম অনুশীলনকারী মহিলা ডাক্তারদের মধ্যে একজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া প্রথম নারী ছিলেন এবং নারী শিক্ষা ও প্রগতির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন ইউরোপীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত প্রথম দক্ষিণ এশীয় নারী চিকিৎসক। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম প্র্যাকটিসিং মহিলা ডাক্তার হিসেবে তিনি পরিচিত। তিনি নারী শিক্ষা ও নারী অধিকার আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কাদম্বিনীর পাশাপাশি, আনন্দীবাঈ জোশীও ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ডিগ্রি লাভ করেন, তবে কাদম্বিনীই ছিলেন ভারতের প্রথম অনুশীলনকারী নারী ডাক্তার।
প্রথম বাঙালি ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী বসু ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ অক্টোবর কলকাতায় পরলোকগমন করেন।








