
একদিকে সুন্দরবন, অন্যদিকে নোনা জল। মাঝখানে মানুষের বসতি। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের এই লড়াই উপকূলের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। কখনো বাঘ-কুমিরের ভয়, কখনো নদীভাঙন, আবার কখনো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। এর সঙ্গে গত কয়েক দশকে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত।
বাড়ছে লবণাক্ততা, কমছে কৃষির সুযোগ, অনাবাদি হয়ে পড়ছে জমি। অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র। জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকায় কেউ কেউ কাজের সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও স্থায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। প্রতারণা বা অনিশ্চিত জীবিকার কারণে অনেকে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসছেন নিজের ভিটায়।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা থেকে খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূল—বিশেষ করে শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদগুলোতে এমন বাস্তবতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। সুন্দরবনকে ঘিরে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকা প্রকৃতি ও মৌসুমি সুযোগের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বন ও নদীতে নিষেধাজ্ঞা থাকলে অনেক পরিবারের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের জীবন এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর একটি অংশ বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাছ, কাঁকড়া, মধু ও বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের আয় কমে যায় বা বন্ধ থাকে।
যতীন্দ্রনগর জেলেপাড়ার সুরমা (ছদ্মনাম) এমনই এক পরিবারের প্রতিনিধি। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে সুন্দরবনের নদী-খালে যাওয়া শুরু করেছিলেন তিনি। এখন স্বামীর সঙ্গে একই জীবিকার ওপর নির্ভরশীল।
স্বামী-স্ত্রী দুজনই মাছ ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালান। কিন্তু বন ও নদীতে নিষেধাজ্ঞা থাকলে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। তখন সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। সীমিত খাদ্য সহায়তা দিয়ে দীর্ঘ সময়ের সংসার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সুরমার মতো বহু পরিবারের হাতে নেই পর্যাপ্ত সঞ্চয়। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে হয়। কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক পরিবার আবারও প্রকৃতি-নির্ভর জীবিকার ওপর ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
জোয়ারের সঙ্গে যাদের জীবন দোলে, ঢেউয়ের সঙ্গে যাদের প্রতিদিনের হিসাব—তাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের বৈজ্ঞানিক ধারণা নয়। এটি তাদের ঘরে, জমিতে, পানির কলসিতে, খাবারের থালায় এবং সন্তানের ভবিষ্যতে প্রতিদিনের বাস্তবতা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় অভিঘাত পড়ছে উপকূলীয় কৃষিতে। নদী ও জলোচ্ছ্বাসের লবণ পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়া এবং দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় আগের মতো ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষকদের একটি অংশ লবণসহিষ্ণু ধানের জাত ও অভিযোজনযোগ্য ফসল চাষের চেষ্টা করছেন। তবে জমির লবণাক্ততা, সেচের পানির সংকট এবং মিঠা পানির স্বল্পতা তাদের উৎপাদন ব্যাহত করছে।
বাগেরহাট ও রামপালের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোথাও কোথাও মাছের ঘেরে লবণ পানি প্রবেশ করানোকে কেন্দ্র করে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, ধান কাটার আগে ঘেরে পানি ঢোকানো হলে ফসলের ক্ষতি হয়। কোথাও কোথাও খালে বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মৎস্যচাষিদের বক্তব্য নিয়ে পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ উপকূলের মানুষের জীবিকায় কৃষি ও মৎস্য—দুই খাতই গুরুত্বপূর্ণ।
উপকূলীয় জনপদের আরেকটি বড় সংকট নিরাপদ খাবার পানি। অনেক এলাকায় পুকুর, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় মিঠা পানির উৎস সীমিত হয়ে পড়েছে।
এর বড় বোঝা বহন করতে হয় নারীদের। অনেক পরিবারে দূরবর্তী স্থান থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। ফলে প্রতিদিনের জীবনে সময় ও শ্রমের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় শুধু নিরাপদ পানি সংগ্রহে।
ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বাঁধ ভেঙে লবণ পানি ঢুকে পড়লে পুকুরসহ মিঠা পানির উৎসগুলো দূষিত হয়। তখন নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় উপকূলের মানুষকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে ত্বকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে। তবে এসব স্বাস্থ্যপ্রভাবের মাত্রা ও কারণ নিরূপণে স্থানীয় পর্যায়ে আরও নিয়মিত স্বাস্থ্যতথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন।
উপকূলের মানুষের কাছে সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস ও রিমাল শুধু ঘূর্ণিঝড়ের নাম নয়। প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভাঙা ঘর, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, নোনা পানি, নষ্ট ফসল, হারানো গবাদিপশু এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ।
একটি দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আরেকটি দুর্যোগ আঘাত হানলে পরিবারের সঞ্চয় ও পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা আরও কমে যায়। ফলে দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষ ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে সুন্দরবন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত; এর প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের অংশ। বাংলাদেশের সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ১৯৯৭ সালে তালিকাভুক্ত হয়। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার।
ইউনেস্কোর নথিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঘূর্ণিঝড়কে সুন্দরবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুন্দরবন উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। জেলে মাছ ধরেন, মৌয়াল মধু সংগ্রহ করেন, বাওয়ালি বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করেন। ফলে বন ও নদীর ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা এখনও ব্যাপক।
একই সঙ্গে সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতে প্রাকৃতিক বাফার হিসেবে ভূমিকা রাখে। ইউনেস্কোও সুন্দরবনের জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ ব্যবস্থার এই প্রাকৃতিক সুরক্ষামূলক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, অবৈধ কর্মকাণ্ড, লবণাক্ততা, মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট চাপও সুন্দরবনের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই সুন্দরবন সংরক্ষণকে শুধু বন রক্ষার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না; এর সঙ্গে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকাকেও যুক্ত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সুন্দরবন বা উপকূলীয় এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পানি, জীববৈচিত্র্য, অভিবাসন ও নগরজীবন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
আইপিসিসির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিভিন্ন নির্গমন পরিস্থিতির ভিত্তিতে ২১০০ সাল পর্যন্ত আঞ্চলিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিভিন্ন মাত্রার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মাত্রা অনেকাংশে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) ২০২৩-২০৫০ গ্রহণ করেছে। দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের আওতায় পানি, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জীবিকা ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা থাকলেই হবে না। সেই পরিকল্পনার সুফল পৌঁছাতে হবে নদীর পাড়ের সেই পরিবারটির কাছে, যে পরিবার প্রতিদিন নোনা পানি, অনিশ্চিত আয় ও দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছে।
উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণ, মানসম্মত বীজ ও কৃষি প্রযুক্তি সহায়তা, মিঠা পানির সংরক্ষণ এবং নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের টেকসই সংস্কারের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির আধার ও কমিউনিটি রিজার্ভার গড়ে তোলা প্রয়োজন। পুকুর পুনঃখনন এবং পরিবারভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাড়ানো যেতে পারে।
কৃষির পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মৎস্যসম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা দরকার। বন ও নদীতে নিষেধাজ্ঞার সময় শুধু খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না রেখে জেলে পরিবারগুলোর দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য উঁচু ভিত্তির ঘর, পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার, দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
একই সঙ্গে সরকারি সহায়তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু অভিযোজনের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও সহায়তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের প্রয়োজন ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সুন্দরবন উপকূলের মানুষের গল্প মূলত টিকে থাকার গল্প। বারবার ঘর হারিয়েছেন, জমি হারিয়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন—তবুও তারা ফিরে এসেছেন নিজের ভিটায়, নদীর পাড়ে, বনের কাছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই লড়াই আর কতদিন?
যে মানুষটি বছরের পর বছর নোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে একটি ছোট ঘর টিকিয়ে রেখেছেন, তাকে শুধু ত্রাণ দিয়ে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তার প্রয়োজন নিরাপদ পানি, উৎপাদনশীল কৃষি, বিকল্প কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং দুর্যোগের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা।
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে উপকূলের মানুষের জন্য; আবার উপকূলের মানুষকেও বাঁচাতে হবে সুন্দরবনের জন্য। কারণ বন ও মানুষ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—তারা একই জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থার অংশ।
আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের উপকূল কেমন হবে—নোনা পানির অনিশ্চিত জনপদ, নাকি নিরাপদ, উৎপাদনশীল ও টেকসই এক উপকূল?
সময় হয়তো তার উত্তর দেবে। কিন্তু প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এখনই।