1. faysal.rakib2020@gmail.com : admin :
  2. thelabpoint2022@gmail.com : Rifat Hossain : Rifat Hossain
সুন্দরবনে উত্তাল সাগর, ইলিশের সংকট ও জেলেদের দীর্ঘশ্বাস - বাংলার কন্ঠস্বর ।। Banglar Konthosor
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০২:০১ পূর্বাহ্ন
নোটিশ :
বিভিন্ন জেলা,উপজেলা-থানা,পৈারসভা,কলেজ পর্যায় সংবাদকর্মী আবশ্যক । 01711073884

সুন্দরবনে উত্তাল সাগর, ইলিশের সংকট ও জেলেদের দীর্ঘশ্বাস

  • প্রকাশিত : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫ 0 বার সংবাদি দেখেছে

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে // বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া অব্যাহত রয়েছে। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ শরণখোলাবরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী, বেতাগী ও বামনা সহ উপকূলীয় অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বন্ধ রয়েছে ইলিশ আহরণ। উত্তাল সাগরে প্রবল ঢেউয়ের মুখে টিকতে না পেরে গত ৩ জুলাই সকাল থেকে শত শত ফিশিং ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছে। ভরা মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে।

মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগের কবলে পড়ে কয়েক কোটি টাকার লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় গভীর সাগর থেকে ফিরে আসছে অধিকাংশ ট্রলার। ফলে উপকূলজুড়ে বাড়ছে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকট।

জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, সাগর থেকে ফেরার পথে বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি ট্রলার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সাগরে কোনো ট্রলার নেই বললেই চলে। ফিরে আসা ট্রলারগুলো সুন্দরবনের দুবলা, আলোরকোল, মেহেরআলী ও ভেদাখালীসহ পাথরঘাটা, মহিপুর ও নিশানবাড়িয়া এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।

শরণখোলার মৎস্য ব্যবসায়ী হবিবুর রহমান ও মো. কবির হাওলাদার বলেন, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গিয়ে কয়েকটি ট্রিপে আশানুরূপ ইলিশ পাওয়া যায়নি। তাদের ভাষায়, সাগর যেন ইলিশশূন্য হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে জলদস্যুদের উৎপাত এবং বৈরী আবহাওয়া। এই ত্রিমুখী সংকটে জেলে ও মহাজনরা চরম বিপাকে পড়েছেন।

কোটি টাকার চালান লোকসানে

ব্যবসায়ীরা জানান, একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। কিন্তু চার-পাঁচ দিন ধরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পুরো চালানই লোকসানে পরিণত হয়েছে। জেলেদের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের ব্যয়ভারও বহন করতে হচ্ছে মহাজনদের। ফলে লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শরণখোলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, “অশান্ত সাগরে টিকতে না পেরে ইলিশ আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। দুর্যোগের কারণে ট্রলারগুলো কয়েক দিন ধরে সুন্দরবন ও উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরা সম্ভব নয়।”

তিনি জানান, শরণখোলা উপজেলায় দুই শতাধিক ফিশিং ট্রলার রয়েছে। প্রতি ট্রিপে একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়। দুর্যোগের কারণে শুধু শরণখোলার ব্যবসায়ীরাই প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

ভরা মৌসুমেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় নদ-নদীতে ইলিশের প্রাচুর্যে মুখর থাকে দক্ষিণাঞ্চল। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই পরিচিত দৃশ্য যেন হারিয়ে গেছে। গভীর সাগরে দিনের পর দিন অবস্থান করেও অধিকাংশ ট্রলার ফিরছে প্রায় খালি হাতে। ফলে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো জেলে পরিবার।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা,বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী, বেতাগী ও বামনা উপজেলার অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মাছের সংকট, সরকারি নিষেধাজ্ঞা, বৈরী আবহাওয়া, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সমুদ্র দস্যুতার আতঙ্ক এবং ঋণের কিস্তির চাপ মিলিয়ে উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে জ্বালানি তেল, বরফ, খাদ্য, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খাতে এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়ায় সেই খরচও উঠে আসছে না। একের পর এক লোকসান গুনতে গিয়ে অনেক ট্রলার মালিক ও জেলে এখন ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনের ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অনেকে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন।

চুলায় আগুন নেই

উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অসংখ্য জেলে পরিবারের চুলায় নিয়মিত আগুন জ্বলছে না। আয় না থাকায় অনেক পরিবার ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছে। কেউ গবাদিপশু বিক্রি করছেন, কেউ সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বন্ধক রাখছেন। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় মাছ ধরা বন্ধ হলেই তাদের জীবন-জীবিকা কার্যত থমকে যায়।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়েক দফা সমুদ্র উত্তাল থাকায় পায়রা সমুদ্রবন্দরে সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। ফলে শত শত ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছে। এতে মাছ ধরার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। অথচ ট্রলারের ঋণ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ অব্যাহত রয়েছে।

সমুদ্র দস্যু ও বাজার সংকট

শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, গভীর সাগরে সমুদ্র দস্যুতার আশঙ্কাও জেলেদের বড় উদ্বেগ। অনেক সময় দস্যুদের ভয়ে নির্ধারিত এলাকায় মাছ ধরতে সাহস পান না তারা। অন্যদিকে ঝড়, দুর্ঘটনা কিংবা ট্রলারডুবির ঘটনা প্রায়ই তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।

ইলিশের সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মৎস্য আড়তগুলোতেও। অন্যান্য বছরের তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যাপ্ত মাছ না আসায় ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে জেলে, ব্যবসায়ী, আড়ত শ্রমিক, বরফকল, পরিবহন শ্রমিকসহ পুরো মৎস্যনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা জেলায় প্রায় ৪৮ হাজার ৬০০ নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। এছাড়া আরও কয়েক হাজার অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যারা সরকারি সহায়তার আওতায় আসতে পারেন না।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর নাব্যতা সংকট, ডুবোচর সৃষ্টি, সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন এবং অবৈধ কারেন্ট জাল ও ছোট ফাঁসের জালের ব্যবহার ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত করছে। ফলে আগের মতো ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।

শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, “নিম্নচাপের ফলে সাগরের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। জেলেরা নিরাপদে উপকূলে অবস্থান করছেন। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ট্রলার সাগরে না পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, “দুর্যোগের কারণে অসংখ্য ট্রলার সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বনরক্ষীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

জেলেদের দাবি, শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; তাদের টিকে থাকার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, জ্বালানি তেলে ভর্তুকি, অনিবন্ধিত জেলেদের নিবন্ধনের আওতায় আনা, সমুদ্র দস্যু দমন, বৈরী আবহাওয়ার সময় বিশেষ সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।

একসময় ইলিশের প্রাচুর্যে পরিচিত দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল আজ অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। জেলেদের ভাষায়, “সাগরে মাছ নেই, ঘরে খাবার নেই, অথচ ঋণের কিস্তি থেমে নেই।” তাই ইলিশের এই সংকট শুধু একটি পেশার নয়; এটি এখন উপকূলীয় অর্থনীতি ও হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার সংকটে রূপ নিয়েছে।

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Comments are closed.

‍এই ক্যাটাগরির ‍আরো সংবাদ
Theme Customized By BreakingNews